ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরি: পুলিশের মামলা নিতে গড়িমসি ও চক্রের দৌরাত্ম্য
রাইড শেয়ার সেবা প্রচলনের পর ঢাকায় মোটরসাইকেলের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনাও। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করছে, যা ভুক্তভোগীদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ: মামলা নিতে অস্বীকৃতি
সম্প্রতি রমজানের এক শুক্রবার জুমার নামাজের সময় ঢাকার তুরাগ এলাকার একটি বাসা থেকে ব্যবসায়ী রাকিবুল হাসানের মোটরসাইকেল চুরি হয়। ঘটনাটি জানার পর তিনি তুরাগ থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নিতে রাজি হয়নি। রাকিবুল হাসান বলেন, ‘মামলা না নেওয়ায় থানায় একটি অভিযোগ দিয়ে এসেছি। ঈদের পর যোগাযোগ করতে বলেছে।’ তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বিষয়টি জানেন না বলে দাবি করেন এবং ভুক্তভোগীকে তাঁর সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে প্রায় দেড় বছর আগের একটি ঘটনায়। উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকা থেকে বায়িং হাউসের মালিক রেজাউল করিমের দামি মোটরসাইকেল চুরি হয়, যা এখনো উদ্ধার হয়নি। রেজাউল করিম বলেন, ‘পুলিশ মামলা নেয়নি। মোটরসাইকেলটি উদ্ধারেরও কোনো চেষ্টা করেনি।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, তাঁর মোটরসাইকেলে জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো ছিল এবং চুরির পর গাজীপুরের কোনাবাড়িতে এর অবস্থান শনাক্ত করা গিয়েছিল। কিন্তু এসব তথ্য দেওয়ার পরও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
ডিএমপি পরিসংখ্যান: চুরির প্রকৃত চিত্র অস্পষ্ট
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র মুহাম্মদ তালেবুর রহমানের মতে, চুরির ঘটনায় নিয়মিত মামলা নিতে হবে এবং উদ্ধার করতে হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো পুলিশ সদস্য মামলা নিতে গড়িমসি করলে তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ডিএমপির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জানুয়ারি মাসে ঢাকায় ১৭টি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে। মোটরসাইকেল ছাড়া ট্রাক, প্রাইভেট কার, সিএনজিসহ বিভিন্ন যানবাহন চুরির ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে ৩৬টি। এসব মামলায় ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ২৮টি যানবাহন উদ্ধার করা হয়েছে।
জানুয়ারিসহ গত ১৩ মাসে ঢাকায় ১১৩টি মোটরসাইকেল চুরির মামলা হয়েছে। এই সময়ে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহন চুরির মামলা হয়েছে প্রায় ৪০০টি। এসব মামলায় ৩৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ২২৮টি যানবাহন উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, মোটরসাইকেল চুরির সব ঘটনায় মামলা হয় না, তাই মামলার তথ্য দিয়ে চুরির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না।
পুলিশের মোটরসাইকেলও উদ্ধার হয়নি
চুরির শিকার শুধু সাধারণ নাগরিকই নন, পুলিশ সদস্যদেরও। উত্তরা পূর্ব থানা এলাকা থেকে গত ৩০ জানুয়ারি একজন পুলিশ সদস্যের মোটরসাইকেল চুরি হয়। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে, কিন্তু এখনো মোটরসাইকেলটি উদ্ধার হয়নি। মোটরসাইকেলটি উদ্ধার না হওয়ায় থানা-পুলিশই মামলাটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে চায় বলে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ভাটারা থানার গ্যারেজ থেকে গত ১০ জানুয়ারি একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে মোটরসাইকেল উদ্ধারসহ আন্তজেলা চোর চক্রের চার সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ইব্রাহিম ও রহমতুল্লাহ, অন্য দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
সক্রিয় একাধিক চক্রের দৌরাত্ম্য
মোটরসাইকেল চুরিতে সক্রিয় একাধিক চক্রের খোঁজ পাওয়া যায় পুলিশ কর্মকর্তাদের কথায়। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ দলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঢাকায় অন্তত ১০টি চক্র সক্রিয় রয়েছে। সাধারণ প্রতিটি চক্রে ৫ থেকে ১০ জন সদস্য রয়েছে।
আবুল কালাম আজাদ নামের একজন একটি চক্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরি করে আসছেন। এই দলে ৩০ থেকে ৩৫ জন রয়েছেন। শুধু ঢাকায় নয়, আবুল কালাম আজাদের ‘নেটওয়ার্ক’ সারা দেশেই বিস্তৃত বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান। বরিশালের বাকেরগঞ্জের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় ৫০টি চুরির মামলা থাকার তথ্যও দেন তাঁরা।
ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরির আরেকটি চক্রের নেতা হিসেবে মাদারীপুর জেলার শিবচরের বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের নাম জানা যায়। জসিম উদ্দিন ২০১০ সালে ঢাকায় আসেন এবং ২০১৩ সালে মোটরসাইকেল চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় ১৩টি চুরির মামলা থাকার তথ্য পাওয়া যায় পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।
চুরির পর বিক্রি ও উদ্ধারে বাধা
চুরির মোটরসাইকেল কম উদ্ধার হওয়া প্রসঙ্গে ডিবির কর্মকর্তারা বলেন, ঢাকা থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে নিয়ে সেগুলো বিক্রি করা হয়। এসব মোটরসাইকেল ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।
ডিবি কর্মকর্তারা আরও উল্লেখ করেন, অনেক সময় চুরির মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর পরিবর্তন করে ফেলা হয়, যে কারণে চুরি হওয়া মোটরসাইকেল খুব বেশি উদ্ধার করা যায় না। এই প্রক্রিয়া চক্রগুলোর কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
সামগ্রিকভাবে, ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু পুলিশের মামলা নিতে গড়িমসি এবং চক্রগুলোর সক্রিয়তা এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে। ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।



