মানি এসকর্ট সেবা: নিরাপত্তা থাকলেও আগ্রহ নেই নগরবাসীর
রাজধানী ঢাকায় মোটা অঙ্কের টাকা ও মূল্যবান স্বর্ণালংকার লুটের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু নগরবাসী পুলিশের বিনামূল্যে প্রদত্ত মানি এসকর্ট সেবা নিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। সম্প্রতি কয়েকটি বড় অঙ্কের লুটের ঘটনা উদ্বেগ বাড়ালেও, ডিএমপির এই সেবার প্রতি মানুষের সাড়া খুবই নগণ্য, বিশেষ করে ব্যক্তিপর্যায়ে যা প্রায় শূন্যের কোটায়।
লুটের ঘটনা ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৬০ ভরি সোনা ও এক লাখ টাকা লুট করে ডাকাতরা। তিনটি মোটরসাইকেলে সাতজন আসা ডাকাতরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে সম্পদ হাতিয়ে নেয়। একইভাবে, ১৯ অক্টোবর রামপুরা থেকে এক ব্যবসায়ীর ২০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার লুট হয়, বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথে তাকে অপহরণ করে অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
এই ধরনের ঘটনা রাজধানীতে মাঝেমধ্যেই ঘটছে, যেখানে মোটা অঙ্কের টাকা, স্বর্ণালংকার বা মূল্যবান মালামাল পরিবহণে ছিনতাই-ডাকাতির আতঙ্কে থাকেন অনেকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে এই আতঙ্ক বহুগুণে বেড়ে যায়, বিশেষ করে ঈদের সময় যখন টাকা বা মূল্যবান জিনিস পরিবহণ অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ডিএমপির মানি এসকর্ট সেবা ও প্রচারণা
নগরবাসীর এসব সমস্যা নিরসনে সারা বছর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বিনা খরচে মানি এসকর্ট সেবা দিয়ে থাকে। শুধু টাকা নয়, স্বর্ণালংকার বা মূল্যবান মালামাল পরিবহণের ক্ষেত্রেও এই সেবা দেওয়া হয়। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এসএন মো. নজরুল ইসলাম জানান, ঈদের ছুটিতে বিয়ের জন্য স্বর্ণের গহনা কিনে কেউ যদি বাসায় নিরাপদে নিয়ে যেতে চান, সেক্ষেত্রে স্থানীয় থানা থেকে এসকর্ট সেবা দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘ডিএমপির মানি এসকর্ট সেবার বিষয়ে মিডিয়াতেও বলা হয়েছে, কিন্তু এ সেবা নিতে মানুষ কম সাড়া দিচ্ছে। আমরা নগরবাসীকে আহ্বান জানাচ্ছি, যে কোনো মূল্যবান জিনিস বা টাকা-পয়সা পরিবহণের সময় যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে সেবাটি নিতে পারেন।’
আগ্রহ না দেখানোর কারণ
একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশির ভাগ ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টারের সামনে মানি এসকর্ট সেবা নিতে পুলিশের ফোন নম্বর দেওয়া থাকে, কিন্তু গ্রাহকরা এ সেবা নিতে আগ্রহী নন। অনেকে পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা তুলে একাই পরিবহণ করছেন। একটি ডেভেলপার কোম্পানির এমডি জানান, তিনি কখনো মানি এসকর্ট সেবা নেননি, কারণ বড় অঙ্কের টাকা পরিবহণে পুলিশের সহায়তা নিলে নানা প্রশ্নের মুখে পড়ার শঙ্কা থাকে। মূলত আস্থার সংকটই এই অনাগ্রহের প্রধান কারণ বলে মনে করেন তিনি।
সেবা নেওয়ার পদ্ধতি
যারা মানি এসকর্ট সেবা নিতে চান, তাদের ডিএমপি কমিশনার বরাবর একটি আবেদন করতে হবে, যাতে উল্লেখ করতে হবে কোন জায়গা থেকে কোথায় যেতে চান। সাধারণত সেবাটি নিতে অন্তত দুই দিন আগে আবেদন করতে হয়, তবে বিশেষ ব্যবস্থায় এক দিনের মধ্যেও সেবা পাওয়া সম্ভব। ঢাকা থেকে ঢাকার বাইরে যেতে চাইলে আলাদা এসকর্ট নিতে হবে।
ডিএমপির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, নগরবাসীর আর্থিক লেনদেন ও নগদ অর্থের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সব থানা চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মানি এসকর্ট সহায়তা দেওয়া হয়। রমনা, মতিঝিল, ওয়ারী ও লালবাগ বিভাগে আব্দুল গণি রোডের পুলিশ কন্ট্রোলরুমে পাঁচটি টিম এবং মিরপুর, গুলশান, উত্তরা ও তেজগাঁও বিভাগে মিরপুর পুলিশ কন্ট্রোলরুমে পাঁচটি টিম সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রমজান ও ঈদে বিশেষ সেবা
রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে টাকা ও মূল্যবান দ্রব্য স্থানান্তর বাড়ায় ডিএমপি বিশেষ এসকর্ট সেবা দিচ্ছে। পুলিশ কন্ট্রোল রুমের ফোন নম্বর ০১৩২০-০৩৭৮৪৫ ও ০১৩২০-০৩৭৮৪৬ এ যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, এছাড়া জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরেও যোগাযোগ করা যাবে।
সর্বোপরি, নিরাপত্তা সেবা উপলব্ধ থাকলেও আস্থা ও সচেতনতার অভাবেই নগরবাসী মানি এসকর্ট সেবা থেকে দূরে থাকছেন, যা অপরাধ প্রবণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।
