যশোরে গ্রামীণফোন কর্মী অপহরণ: মুক্তিপণ দাবি ও আত্মসাতের অভিযোগ
যশোর সদর উপজেলায় ওষুধ ব্যবসায়ী অপহরণের রেশ না কাটতেই এবার গ্রামীণফোনের এক কর্মী অপহরণের শিকার হয়েছেন। আবিদ হোসেন (২৬) নামে এই কর্মীকে অপহরণ করে তার পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্ত্রী কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অপহরণের বিস্তারিত ঘটনা
আবিদ হোসেন যশোর সদর উপজেলার বলরামপুর গ্রামের নূর মোহাম্মদের ছেলে। তিনি গ্রামীণফোনের যশোর সদরের ছাতিয়ানতলা অফিসের মার্কেটিং ও সেলস বিভাগে কর্মরত ছিলেন। বুধবার (১১ মার্চ) সকালে তিনি কর্মস্থলের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন। দুপুরে মোবাইল ফোন করে জানান, তিনি দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য দোকানে যাচ্ছেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
রাত প্রায় ৮টার দিকে অফিস থেকে জানানো হয় যে আবিদ দুপুরে খাবারের বিরতিতে গিয়ে আর ফেরেননি। বুধবার রাত ৯টার পর একটি অপরিচিত নম্বর থেকে তার স্ত্রী মিনি খাতুনের মোবাইল ফোনে কল আসে। ফোন ধরতেই আবিদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাকে বাঁচানোর আকুতি জানান। এর কিছুক্ষণ পর আবিদের বাবার ফোনে কল দিয়ে বলা হয়, এখনই ১ লাখ টাকা বিকাশে পাঠাতে হবে, তা না হলে আবিদকে মেরে ফেলা হবে।
মুক্তিপণের হুমকি ও বার্তা
অপহরণকারীরা আবিদের কাছ থেকে নগদ টাকা ও রিচার্জ কার্ড ছিনিয়ে নিয়েছে বলেও জানান এবং টাকা না পেলে হত্যার হুমকি দেয়। এমনকি আবিদের বাবার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরেও বারংবার খুদেবার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে টাকার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। বাবার মোবাইলে পাঠানো এসএমএসে লেখা ছিল, ‘তোর ছেলের গাড়ি মাড়ি নিইনি আমরা। তোর ছেলেকে নিছি আর তোর ছেলের কাছে টাকাপয়সা নিছি। তোর ছেলের নম্বর ফোনটোন সব আমাদের কাছে। তোর ছেলেরে যদি বাঁচাতে চাস, এক লাখ টাকা মেরে দে।’
এ ঘটনায় বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে মিনি খাতুন যশোর কোতোয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন।
আত্মসাতের অভিযোগ ও দ্বিতীয় অভিযোগ
এদিকে, আবিদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের জন্য আত্মগোপনের অভিযোগে একই থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন গ্রামীণফোনের ডিস্ট্রিবিউটর এমকে গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আরমান এন্টারপ্রাইজ-২-এর সুপারভাইজার ওমর ফারুক। ওমর ফারুক অভিযোগে উল্লেখ করেন, তাদের কর্মী আবিদ হোসেন গত ১১ মার্চ দুপুর ২টার দিকে প্রতিদিনের মতো মার্কেটের বিভিন্ন দোকান থেকে আদায় করা নগদ টাকা, বিক্রীত লোডের টাকা ও রিচার্জ কার্ড বিক্রির প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং অফিসের পাওনা ৮০ হাজার টাকা মোট ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকার হিসাব বুঝিয়ে না দিয়ে আসছি বলে অফিস থেকে বের হয়ে যান।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীকালে আবিদ আর অফিসে ফেরেননি এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, অফিসের টাকা আত্মসাতের জন্য তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। আবিদের পরিবারের কাছে যে মোবাইল নম্বর থেকে মুক্তিপণের টাকা চাওয়া হয়েছে, সেটি আবিদেরই নম্বর বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত
এ ব্যাপারে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘এ ঘটনায় পরপর দুটি অভিযোগ পেয়েছি আমরা। পরিবারের পক্ষ থেকে অপহরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অফিসের পক্ষ থেকে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে আরও একটি অভিযোগ পাওয়া গেছ। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে এবং ভিকটিমকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে।’
যশোরে অপহরণের ধারাবাহিকতা
এর আগে ২ মার্চ যশোর শহরের শংকরপুর এলাকা থেকে ওষুধ ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম অপহৃত হন, যার মুক্তিপণ হিসেবে ১ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল। র্যাব সদস্যরা ৯ দিন পর গতকাল বুধবার রাতে চৌগাছা উপজেলা থেকে তাকে উদ্ধার করেন। এরই মধ্যে আবারও এ অপহরণের ঘটনা ঘটলো, যা যশোর অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তারা অপহরণকারীদের শনাক্ত করতে এবং আবিদ হোসেনকে উদ্ধারে জোরালো তদন্ত চালাচ্ছে। এ ঘটনায় স্থানীয় সম্প্রদায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত ন্যায়বিচার কামনা করেছেন।



