মাদারীপুরে আধিপত্যের দ্বন্দ্বে হত্যা-ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনা, উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে
মাদারীপুরে আধিপত্য দ্বন্দ্বে হত্যা-ভাঙচুর-লুটপাট

মাদারীপুরে আধিপত্যের দ্বন্দ্বে হত্যা-ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনা

মাদারীপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তিকে হত্যার জেরে প্রতিপক্ষের বসতঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সদর উপজেলার নতুন মাদারীপুর এলাকায় এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। এ সময় একাধিক হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কয়েকটি বসতঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যা এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

হত্যার বিস্তারিত ও প্রতিশোধমূলক হামলা

এদিন সকাল সাতটার দিকে আলমগীর হাওলাদার (৫০) নামের এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করে তাঁর প্রতিপক্ষের লোকজন। হামলাকারীরা তাঁর ডান হাতের কবজি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং তাঁর ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করে। নিহত আলমগীর হাওলাদার মাদারীপুর পৌরসভাধীন ২ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন মাদারীপুর এলাকার মৃত হাফেজ হাওলাদারের ছেলে ছিলেন। তিনি পেশায় একজন ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসায়ী ছিলেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে সদর উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি শাকিল মুনশি হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

হত্যার পর প্রতিপক্ষ হাসান মুনশিসহ তাঁর লোকজন এলাকা ছেড়ে চলে যান। এই সুযোগে একটি পক্ষ রাস্তাঘাট অবরোধ করে প্রতিপক্ষের সমর্থিত কয়েকটি বাড়িঘরে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন দেয়। ইফতারের পরেই এ ঘটনার সূত্রপাত ঘটে, যা এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়ায়।

নিয়ন্ত্রণে আনতে যৌথ বাহিনীর তৎপরতা

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও র‌্যাবের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ শুরু করেন। মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানান, ‘হামলায় পাঁচ থেকে ছয়টি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। এ ছাড়া তারা বেশ কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। যারা এ কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং এলাকায় উত্তেজনা এড়াতে যৌথ বাহিনীর টহল অব্যাহত রয়েছে।

বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক পটভূমি

এদিকে আলমগীরকে হত্যার প্রতিবাদে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তাঁর লাশ নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। এ সময় হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার রাস্তি ইউনিয়নের ‘নতুন মাদারীপুর’ এলাকাটির একটি অংশ পড়েছে মাদারীপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে। এই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান আক্তার হাওলাদার দীর্ঘদিন ধরে নতুন মাদারীপুর এলাকায় এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ওই এলাকায় সদর উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি শাকিল মুনশির আধিপত্য দেখাতে শুরু করেন।

২০২৫ সালের ২৩ মার্চ নতুন মাদারীপুর এলাকায় শ্রমিক দলের একটি কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে শাকিল মুনশিকে কুপিয়ে হত্যা করে মনিরুজ্জামানের লোকজন। যদিও হত্যাকাণ্ডের আগেই মনিরুজ্জামান কারাগারে ছিলেন, তবে রাজনৈতিক বিরোধ থাকায় শাকিল হত্যা তাঁকে ও তাঁর ছেলেকে আসামি করা হয়। এ মামলার আসামি ছিলেন মনিরুজ্জামানের চাচাতো ভাই নিহত আলমগীর হাওলাদারও।

দীর্ঘদিনের বিরোধ ও সাম্প্রতিক ঘটনা

মনিরুজ্জামান লোকজনের এলাকায় প্রবেশ করাকে কেন্দ্র করে নিহত শাকিল মুনশির ভাই হাসান মুনশির নেতৃত্বে সম্প্রতি অন্তত দশবার রাতভর টর্চলাইট জ্বালিয়ে ধাওয়া ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতিবার হামলায় উভয় পক্ষ অসংখ্য হাতবোমা নিক্ষেপ করে নিজেদের আধিপত্য দেখায়, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে।

এ বিরোধের জের ধরেই মনিরুজ্জামানের চাচাতো ভাই আলমগীর হাওলাদারের বসতঘরে ঢুকে হামলা চালান প্রতিপক্ষ হাসান মুনশি ও তাঁর লোকজন। এ সময় আলমগীরকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয় এবং তাঁর বসতঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করে হামলাকারীরা। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মাসুদ ব্যাপারী (৫৪) নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ।

বর্তমানে এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে যৌথ বাহিনীর কঠোর নজরদারি চলছে, এবং আইনগত প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।