বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পুলিশিং: আস্থা ও যোগাযোগের মাধ্যমে সংস্কারের আহ্বান
গণতান্ত্রিক পুলিশিং: আস্থা ও যোগাযোগে সংস্কার

বাংলাদেশে পুলিশিং সংস্কার: গণতান্ত্রিক পদ্ধতির দাবি

বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলছে। জননিরাপত্তা ও সম্পদ রক্ষায় পুলিশ অপরিহার্য হলেও, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন গণতান্ত্রিক পরিক্রমায় প্রবেশ করেছে দেশ, তাই পুলিশিং ব্যবস্থার সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

পুলিশের বর্তমান সংকট: আস্থাহীনতা ও মানসিক চাপ

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের শহুরে নাগরিকদের পুলিশের প্রতি আস্থা খুবই কম। পুলিশ সদস্যরা জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি মারাত্মক মানসিক চাপে ভুগছেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২৯.৬% সদস্য পেশাগত উচ্চচাপ, ৪৮.৭% উদ্বেগ এবং ১৮.৪% বিষণ্নতায় আক্রান্ত। জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী ঘটনাবলি পুলিশের মনোবলকে আরও দুর্বল করেছে।

পুলিশের উপর দমন-পীড়ন, মামলা বাণিজ্য, ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তার, ক্রসফায়ার, হেফাজতে মৃত্যু এবং ঘুষের অভিযোগ রয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানে এক শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকের মারধরের ঘটনা এই ধারাবাহিকতারই অংশ।

যোগাযোগের শক্তি: আচরণগত পরিবর্তনের চাবিকাঠি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশ ও জনগণের মধ্যে অবিরাম যোগাযোগ প্রক্রিয়া আস্থা গড়ে তুলতে পারে। উন্নয়ন যোগাযোগের মাধ্যমে আচরণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব, যা বলপ্রয়োগ ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে পারে। কানাডার উদাহরণে দেখা যায়, সেখানে পুলিশ কর্মকর্তারা শান্তির দূত হিসেবে কাজ করেন এবং যোগাযোগের মাধ্যমে সাধারণ দ্বন্দ্ব মীমাংসা করেন।

কানাডাপ্রবাসী লেখক অ্যালভিন দিলীপ বাগচীর মতে, সেখানে পুলিশ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যায় বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে বিপদে মানুষ বন্ধুকে ডাকলেও, কানাডায় পুলিশকে ডাকা হয়। এভাবেই আস্থাশীল সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

সংস্কারের প্রস্তাব: প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের গুরুত্ব

পুলিশিং সংস্কারে বহু প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু পোশাক বদলের বাইরে দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণগত পরিবর্তন স্পষ্ট নয়। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উন্নয়ন যোগাযোগভিত্তিক কর্মসূচি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত, যেখানে মনোযোগ দিয়ে শোনা, সহানুভূতি প্রকাশ ও তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার রবার্ট পিলের পিলিয়ান নীতিতে বলা হয়েছে, প্রভাবিতকরণ, পরামর্শ ও সতর্কীকরণ ব্যর্থ হলে তবেই বলপ্রয়োগ প্রয়োজন। অর্থাৎ, যোগাযোগই পুলিশিংয়ের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।

সফল উদাহরণ: জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ

২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের ৫০০-এর বেশি জলদস্যু অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। জলদস্যুনেতা মোস্তফা শেখের মতে, সরকার, র‍্যাব ও গণমাধ্যমের আস্থাভিত্তিক যোগাযোগই এতে সহায়ক হয়েছে। অথচ ১৯৮০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শতাধিক জলদস্যু বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে, যোগাযোগের মাধ্যমে অপরাধীকে সংশোধন করা সম্ভব।

ভবিষ্যৎ পথ: প্রতিরোধমূলক ও সম্পৃক্ত পুলিশিং

পুলিশিং হতে হবে প্রতিরোধমূলক এবং জন-অংশগ্রহণমূলক। কমিউনিটি পুলিশিং উদ্যোগ পুনরুজ্জীবিত করে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। ইতিহাসে টাইটিং পদ্ধতির মতো স্থানীয় শান্তিরক্ষা ধারণা আধুনিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা যেতে পারে।

পুলিশ যেন জনগণের কাছে কেবল বিশেষ পোশাকধারী বাহিনী না হয়ে সমাজের অংশ হয়ে ওঠে, তার জন্য নিবিড় যোগাযোগ অপরিহার্য। আধুনিক ও পেশাদার বাহিনী গড়ে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সমসাময়িক প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

মাহমুদুল হক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, এই মতামত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক পুলিশিং নির্মাণ ছাড়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো সুদৃঢ় করা সম্ভব নয়।