কোস্টগার্ডের অভিযানে ১৭ হাজার কোটি টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ
বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ব্যাপক অভিযানে গত এক বছরে প্রায় ১৭ হাজার ৫১৬ কোটি টাকার অবৈধ পণ্য, নিষিদ্ধ জাল ও মৎস্যসম্পদ জব্দ করা হয়েছে। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কোস্টগার্ড কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সমুদ্রসীমা, উপকূলীয় অঞ্চল ও নদীর তীরবর্তী এলাকায় ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এই অভিযানগুলোতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
চোরাচালান ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের বিস্তারিত
কোস্টগার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চোরাচালান বিরোধী অভিযানে প্রায় ১৫০ কোটি ৪১ লাখ টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ডাকাত ও সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ অভিযানে ২০৩টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ৩৮০টি দেশীয় অস্ত্র এবং ৪ হাজার ৬৬৮টি তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ১ হাজার ৫২৭ জন সন্ত্রাসী, ডাকাত, বনদস্যু ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছে।
মানব পাচার রোধে কোস্টগার্ডের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অভিযানে ১৫ জন মানব পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে এবং একই সময়ে পাচারের শিকার ২৯৭ জন ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। এই সাফল্য দেশের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষায় কোস্টগার্ডের অগ্রণী ভূমিকার প্রতিফলন ঘটায়।
মাদকবিরোধী অভিযানের বিশাল অর্জন
মাদকবিরোধী অভিযানে কোস্টগার্ডের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। প্রায় ১৯৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা মূল্যের ৩৮ লাখ ৯২ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ৬৯ লাখ টাকা মূল্যের ২৩০ কেজি গাঁজা, ১ কোটি ১১ লাখ টাকা মূল্যের ৩ হাজার ২৭৩ বোতল বিয়ার ও হুইস্কি, ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ৩ কেজি ক্রিস্টাল মেথ (আইস), ৩৫ লাখ টাকা মূল্যের সাড়ে ৩ লাখ অবৈধ সিগারেট এবং ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা মূল্যের ২৬ হাজার লিটার মদ জব্দ করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৬৭০ জন মাদক কারবারিকে আটক করা হয়েছে, যা মাদকবিরোধী লড়াইয়ে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে অভিযানের ফলাফল
মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে পরিচালিত অভিযানে কোস্টগার্ডের সাফল্য আরও চমকপ্রদ। এক বছরে প্রায় ১৭ হাজার ১৫২ কোটি টাকা মূল্যের ৫ লাখ ৬০ হাজার কেজি জাটকা, ৯০ কোটি ৮৮ লাখ রেণু পোনা এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার কেজি জেলিসহ চিংড়ি জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া এসব অভিযানে ২৫৩ কোটি ২৯ লাখ মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, ৫ লাখ ২৮ হাজার মিটার বেহুন্দি জাল এবং ৬৮ কোটি মিটার অন্যান্য নিষিদ্ধ জাল জব্দ করা হয়েছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
নিরাপত্তা জোরদার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
কোস্টগার্ডের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বন্দর এলাকার নিরাপত্তা জোরদারের ফলে বহিঃনোঙ্গর এলাকায় দস্যুতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সমুদ্রবন্দরের রেটিং আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তেলবাহী জাহাজ এমটি বাংলার জ্যোতি, এমটি বাংলার সৌরভ এবং বিএলপিজি সোফিয়ায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কোস্টগার্ড ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ হিসেবে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে কাজ করেছে।
এই ধরনের কার্যক্রমের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন থেকে ‘লেটার অব কমেন্ডেশন’ অর্জন করেছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে কোস্টগার্ডের অবদানের প্রতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতির প্রতিফলন ঘটায়।
কোস্টগার্ডের এই অভিযানগুলো দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সামুদ্রিক সীমান্তে অবৈধ কার্যকলাপ রোধে এই বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় একটি উল্লেখযোগ্য মাত্রা যোগ করেছে।
