নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শেষে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে থানাগুলোকে রাজনৈতিক দল বিবেচনায় না নিয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে বলা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের অপরাধী যেই হোক না কেন, কোনও ধরনের ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার বিস্তারিত চিত্র
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে বড় ধরনের কোনও সংঘাত-রক্তপাত ছাড়াই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু নির্বাচনের পর দিন থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটতে শুরু করে। বিজয়ী প্রার্থীর পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের দ্বারা পরাজিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে দুজনের মৃত্যুসহ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে।
রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন ও গণভোট শেষে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পৃথক ঘটনায় মুন্সীগঞ্জ ও বাগেরহাটে দুই যুবক এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে এক শিশু নিহত হয়। বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে অন্তত ৩০ জেলায় দুই শতাধিক সংঘর্ষে তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। ৩৫০টির বেশি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
রাজনৈতিক নেতাদের উদ্বেগ ও হুঁশিয়ারি
এসব সংঘাতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও। একইসঙ্গে এসব নির্যাতন বন্ধ করা না হলে কঠোর অবস্থান নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। অন্যদিকে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও যেকোনও মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং কোনও অজুহাতে দুর্বলের ওপর অবিচার মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
স্থানীয় সংঘর্ষের ঘটনা ও পুলিশের পদক্ষেপ
নির্বাচনের একদিন পর শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) নাটোরের বড়াইগ্রামে জামায়াত কর্মীকে মারধরের জেরে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। এ সময় বেশ কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণও করা হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ৬ জন আহত হয়েছেন।
বড়াইগ্রাম থানার ওসি আব্দুস সালাম বলেন, "সংঘর্ষ ও বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে থানায় এজাহার দেওয়া হয়েছে এবং এই ঘটনায় বিএনপি সমর্থক ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "নিরপেক্ষভাবে কোনও চাপের কাছে মাথানত না করে আইন অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। যে-ই আইন ভঙ্গ করবে তার বিরুদ্ধেই আমরা নির্দ্বিধায় ব্যবস্থা নেবো। আমাদের শীর্ষ কর্মকর্তারাও সেই রকমই নির্�েশ দিয়েছেন।"
একইদিন ফরিদপুরের সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় ৪ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সালথা থানার এসআই মো. শাজাহান।
ধর্ষণের অভিযোগ ও তদন্ত
এছাড়া নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার রাতে হাতিয়ার চানন্দী ইউনিয়নে শাপলা কলি প্রতীকে ভোট দেওয়ার জেরে এক তিন সন্তানের জননীকে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নোয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভুক্তভোগী নারী সাংবাদিকদের কাছে এ অভিযোগ করেন।
তবে এ বিষয়ে রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, "গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একজন নারী অভিযোগ করেছেন যে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। বিষয়টি জানার পর ঘটনা তদন্তের জন্য ঘটনাস্থলে পুলিশের একজন এএসপিকে পাঠানো হয়। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে এ ধরনের কোনও ঘটনা ঘটেনি। তবে আশ্রয়ণ প্রকল্পে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে তিনি ঘটনারও দুই ঘণ্টা আগে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তবুও আমরা লিখিত অভিযোগ পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।"
সরকারি প্রতিক্রিয়া ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান
এদিকে নির্বাচনের পর সহিংসতায় চার জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও, প্রকৃত অর্থে নির্বাচনি সহিংসতায় একজন মারা গেছেন বলে উপদেষ্টা পরিষদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
তিনি বলেন, "স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তার বক্তৃতায় বলেন, যদিও নির্বাচনের পর চার জনের মৃত্যুর কথা শোনা যাচ্ছে। তার মধ্যে সত্যিকার অর্থে ইলেকশন রিলেটেড ভায়োলেন্সে মারা গেছেন একজন। আর হাতিয়ার নারীর বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এ বিষয়ে একটা তদন্ত কমিটি করে দেওয়া হচ্ছে, তারা এ বিষয়টা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখবেন, ইনভেস্টিগেট করবেন।"
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কৌশল ও সাইবার মনিটরিং
নির্বাচন পরবর্তী সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, "নির্বাচনের পর যারা জয়ী হন এবং যারা পরাজিত হন তাদের মধ্যে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়— এটা আমাদের পুরোনো অভ্যাস। তাই এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো হয়েছে।"
তিনি বলেন, "কিছু জায়গায় সংঘর্ষ হয়েছে। যেসব জায়গায় এমনটা হয়েছে আমাদের পক্ষ থেকে দেশের সব থানায় বলে দেওয়া হয়েছে কে কোন দলের তা বিবেচনায় না নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মামলা নিতে। যাতে কোনোভাবেই পুলিশের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। কারও প্রতি যেন পক্ষপাতমূলক আচরণ করা না হয় সেই দিকটা বিশেষভাবে লক্ষ রাখা হচ্ছে।"
নির্বাচন পরবর্তী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এ ধরনের যেকোনও ঘটনার বিষয়ে পুলিশের সাইবার মনিটরিং টিম সক্রিয় আছে। যেকোনও ধরনের ঘটনার সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সাইবার টিম সঙ্গে সঙ্গে তা যাচাই করছে। মিথ্যা হলে তা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর সত্য হলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।"



