রেখে বাংলা শিশুসাহিত্যে 'মজার দেশ' সত্যিই এক মজার কবিতা। ইহা লিখিয়াছেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার। তাহার ভাষায়: এক যে আছে মজার দেশ, সব রকমে ভালো,/ রাত্তিরেতে বেজায় রোদ, দিনে চাঁদের আলো!/ আকাশ সেথা সবুজবরণ গাছের পাতা নীল:/ ডাঙ্গায় চরে রুই কাতলা জলের মাঝে চিল!/সেই দেশেতে বেড়াল পালায়, নেংটি-ইঁদুর দেখে;/ ছেলেরা খায় 'ক্যাস্টর-অয়েল'-রসগোল্লা ! কোথায় বিড়াল দেখিয়া ইঁদুর পালাইবে, তাহা না করিয়া ইঁদুর দেখিয়া বিড়াল পালাইতেছে! মজার দেশের এইসব মজার কথা বুঝিতে হইলে চক্ষু মুদিলেই চলিত। কিন্তু আজকাল চক্ষু খুলিয়াও এমন ঘটনা দেখা যায়। দেখা যায় পুলিশ দেখিয়া ডাকাত না পালাইয়া উলটা ডাকাত দেখিয়া পুলিশ পালাইতেছে!
নচিকেতার গানে উল্টো রাজা
বাংলার জনপ্রিয় শিল্পী নচিকেতাও কম যান না। তিনি সরাসরি সেই পুলিশের প্রসঙ্গ টানিয়া গাহিয়াছেন: 'কোনো এক উলটো রাজা, উলটো বুঝলি প্রজার দেশে/চলে সব উলটো পথে, উলটো রথে, উলটো বেশে/পারে না ধরতে পুলিশ সত্যি অপরাধী, যারা বাড়ছে সুখে/নিরীহ প্রেমিক-প্রেমিকাদের ধরে, নিচ্ছে টাকা লেকের ধারে, পুজোর মুখে।' সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ! অনেক কিছুই উলটাপালটা দেখা যাইতেছে।
পুলিশের প্রতি ভয় হারিয়ে যাচ্ছে
জগতের স্বাভাবিক নিয়ম এই যে, পুলিশ দেখিলে অপরাধী ও দুষ্কৃতকারীরা পলায়ন করে; তাহারা দণ্ডবিধির ভয়ে আত্মহারা থাকে, তটস্থ থাকে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশে এমনও দেখা গিয়াছে যে, পুলিশের তাড়া খাইয়া আসামি প্রাণভয়ে ছাদ হইতে লাফ দিয়া কিংবা পুকুরে ঝাঁপ দিয়া মৃত্যুবরণ করিয়াছে। কিন্তু 'উল্টো রাজা উল্টো বুঝলির' দেশের মতো বাংলাদেশের পুলিশ কি আজ উলটা রথে ধাবমান! চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশের শুধু পরিধেয় বস্ত্র বা পোশাকেরই পরিবর্তন ঘটে নাই, বরং বাস্তব ক্ষেত্রেও সাধারণ জনগণের সহিত তাহাদের এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হইয়াছে বলিয়া নিন্দুকেরা মনে করেন। একদিকে কেহ কেহ পুলিশের নূতন পোশাকের কারণে তাহাদের ভুল করিয়া সিকিউরিটি গার্ড মনে করিয়া প্রমাদ গুনিতেছেন, অন্যদিকে কেহ কেহ জোর গলায় বলিয়া বেড়াইতেছেন, পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল ভাঙিয়া পড়িয়াছে।
ফকিরহাটের ঘটনা: অপরাধীদের স্পর্ধা
বাগেরহাটের ফকিরহাটে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালামাল লুট এবং সেই মালামাল উদ্ধার করিতে আসিয়া ডাকাতদের তাড়া খাওয়া পুলিশ সদস্যদের অসহায়ত্ব দেখিয়া এমনটি মনে করা কি বাতুলতা হইবে? গতকাল ইত্তেফাকের অনলাইনের সেই খবরটি আদ্যোপান্ত পড়িয়া জানা গেল, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হইতে আইনানুগভাবে ক্রয়কৃত প্রায় সাড়ে তেরো লক্ষ টাকার পরিত্যক্ত অ্যালুমিনিয়াম-বোঝাই একটি ট্রাক গত বৃহস্পতিবার রাত্রিকালে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করিয়াছিল। পথিমধ্যে ফকিরহাটের সুকদাড়া এলাকায় পৌঁছাইলে ১৫-১৬ জনের একটি সুসংগঠিত ডাকাত দল ট্রাকটির গতিরোধ করে এবং চালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করিয়া মালামালসহ ট্রাকটি ছিনতাই করিয়া লইয়া যায়। সংবাদ পাইয়া ফকিরহাট মডেল থানা পুলিশ যখন অভিযানে নামে, তখন সেই অভাবনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অপরাধীরা পলায়ন করিবার পরিবর্তে উলটা পুলিশকেই ধাওয়া করে। যদিও পরবর্তীকালে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করিয়া লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার ও দুই জনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হইয়াছে, তথাপি পুলিশের উপর এই আক্রমণের স্পর্ধা কোথা হইতে আসিল তাহাই চিন্তার বিষয়।
সমাজের জন্য অশনিসংকেত
ইহা কি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত নহে? এই ঘটনায় বোঝা যায়, অপরাধীদের হৃদয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি যে ধরনের ভয় বা শ্রদ্ধা বিদ্যমান থাকা আবশ্যক তাহা আজ নাই বা বিলুপ্তপ্রায়। যখন অপরাধীপক্ষ রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে পালটা আক্রমণের দুঃসাহস দেখায়, তখন বুঝিতে হইবে সেই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা কতটা কঠিন। এমতাবস্থায়, পুলিশ বাহিনীকে অত্যাধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রসহ সব রকমের লজেস্টিক সাপোর্ট দিয়া তাহাদের মনোবল চাঙ্গা করিবার নূতন উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে। তাহারা যেন উন্নত পেশাদারিত্বের সঙ্গে নিরপেক্ষ ও বিধিমোতাবেক দায়িত্ব পালন করিতে পারে তাহার নিশ্চয়তা দিতে হইবে। একই সঙ্গে জনমনে পুলিশের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখিতে হইবে। মাঠপর্যায়ে কর্তব্যরত সদস্যদের প্রদান করিতে হইবে নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা।



