কলকাতার ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখেমুখে আজ শুধু রোদের তেজ ছিল না, ছিল একরাশ জমে থাকা বারুদ। বিগত বিধানসভা, পৌরসভা ও লোকসভা নির্বাচনে যারা নিজেদের ভোট নিজে দিতে পারেননি, আজ তিলোত্তমার বুথে বুথে সেই ভোটারদের কণ্ঠেই শোনা গেলো শাসকদলের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিরোধের সুর। কলকাতার অলিগলিতে আজ একটাই আলোচনা, ‘আর কত দিন ভয় দেখিয়ে আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে?’
সত্তরোর্ধ্ব ভোটারের চ্যালেঞ্জ
দক্ষিণ কলকাতার কসবার এক স্পর্শকাতর বুথের সামনে দাঁড়িয়ে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ তরনী সরকার সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন। গত লোকসভা নির্বাচনে তাকে বুথ থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। এদিন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানকে সামনে পেয়ে তার সপাট জবাব, ‘গতবার তো আমার হয়ে ওরা ভোট দিয়ে দিয়েছিল, আজ দেখে নেব কার কত ক্ষমতা! আমার গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি আর সহ্য করব না।’ তার এই ক্ষোভ যেন আজ গোটা শহরের প্রতিটি বুথের সাধারণ মানুষের মনের কথা।
ভোটারদের অভিযোগ
ভবানীপুরে রমেশ মিত্র রোডের একটি বুথ থেকে ভোট দিয়ে বেরিয়ে শুভাশিস দে কিছুটা উত্তেজিত হয়েই বললেন, ‘এবার আর আমার প্রয়াত বাবা ভোট দিতে আসেননি। এতদিন শুনতাম আমার সঙ্গে দেখা না হলেও বাবা ঠিক এসে ভোটটা দিয়ে যেতেন বিকেলবেলা। এবার তিনি আর আসেননি!’ এদিন কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে সেই সব ভোটারদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো, যারা গত কয়েক বছরে তৃণমূলের ক্যাডার বাহিনীর ‘দাদাগিরি’র কারণে বুথমুখী হতে পারেননি। বেলেঘাটা এবং কসবার মতো এলাকায় ভোটারদের অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল যাতে তারা ভোট দিতে না যান।
বালিগঞ্জের গৃহবধূ রত্না সাহা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘গত নির্বাচনে আমাকে বুথে ঢুকতেই দেয়নি স্থানীয় ছেলেরা। বলা হয়েছিল আমার ভোট হয়ে গেছে। এবার কোমর বেঁধে এসেছি। আমরা কোনও রাজনৈতিক দলের ভৃত্য নই, নাগরিক হিসেবে মর্যাদা চাই।’ শাসকদলের বিরুদ্ধে মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহই যেন আজকের ভোটের প্রধান হাতিয়ার।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতির পাশাপাশি গোটা দিন ধরে ভোটারদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ কড়াকড়ি এবং বুথে বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জোরালো টহল বঞ্চিত ভোটারদের মনে বাড়তি সাহস জুগিয়েছে। অনেক জায়গায় দেখা গেছে, ভোটাররা নিজেরাই জোট বেঁধে বুথে আসছেন যাতে কোনও ‘বহিরাগত’ তাদের পথ আটকাতে না পারে। ভবানীপুরের যদুবাবুর বাজারের কাছে তরুণ ভোটার দীপ্ত সাহা বলেন, ‘ভোট লুঠের সংস্কৃতি কলকাতা থেকে বিদায় করার সময় এসেছে। যারা মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়, তাদের উপযুক্ত জবাব এবার ইভিএমে দেওয়া হলো।’
বিশ্লেষকের মতামত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ঝন্টু বরাইক এ বিষয়ে বলেন, “বিগত নির্বাচনগুলোতে ছাপ্পা ভোট এবং বুথ দখলের তিক্ত অভিজ্ঞতা আজও ভোটারদের স্মৃতিতে টাটকা। শাসকদলের স্থানীয় নেতাদের ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকির বিরুদ্ধে আজ সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ দেখা গেছে। যারা আগে ভোট দিতে পারেননি, তারা মনে করেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে না পারা মানেই স্বৈরাচার, যার পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।” তার মতে, ভোটারদের এই ‘আগ্রাসী’ মেজাজ শাসক শিবিরের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। কারণ, যারা এতদিন ভয়ে চুপ করে ছিলেন, আজ তারাই লাইনে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সবথেকে বেশি সরব।
ভোটের ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া
ভোট কেমন হলো? বিজেপির অন্যতম মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, ‘মমতা বনাম জনতার লড়াইয়ে জিতে গেলো জনতা। আর এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। খুব ভালো ভোট হয়েছে। এবার বিজেপি সরকার গড়তে চলছে।’
এদিন সকালে কালীঘাট চত্বরে ভবানীপুরের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে বিক্ষোভ হলেও বেলা গড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিত্রের বদল দেখা যায়। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের দেখে শাসকদলের ক্যাম্প অফিসের দিকে এগিয়ে যান শুভেন্দু। প্রথমে কিছুটা হতচকিত হলেও পরে তৃণমূল কর্মীরা হেসে কথা বলেন বিজেপি প্রার্থীর সঙ্গে। এমনকি এক তৃণমূল কর্মী একটি বোতলের ঠান্ডা পানীয় শুভেন্দুর দিকে এগিয়ে দেন। হাসিমুখে সেই পানীয় খেয়ে তৃণমূলের ক্যাম্প থেকে আবার এগিয়ে যান শুভেন্দু।
শেষ কথা
দিনের শেষে তিলোত্তমার রাজপথে যে লম্বা লাইন দেখা গিয়েছে, তা কেবল প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার জন্য নয়; বরং বিগত দিনের অপমানের বদলা নেওয়ার এক নীরব বিপ্লব। ফলাফল যা-ই হোক, ভোটারদের এই কড়া প্রতিক্রিয়া বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, কলকাতার মানুষ আর ভয় দেখিয়ে দমানোর দিন শেষ করে দিতে বদ্ধপরিকর।



