৩ মাসে দেশে ৮৫৪ হত্যাকাণ্ড: শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতায় অস্থির রাজধানী
গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে রাজধানী ঢাকায় ১০৭টি খুনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। জানুয়ারিতে দেশে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঢাকায় জানুয়ারিতে ৩৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি এবং মার্চে ৩৩টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর ঘটনা ও পুলিশের বক্তব্য
চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে ঢাকায় অন্তত ১৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার কুতুকছড়ি আবাসিক এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে ধর্মসিং চাকমা নিহত হন এবং ভাগ্যশোভা চাকমা ও কৃপাসোনা চাকমা নামে দুই নারী গুরুতর আহত হন। বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র এএইচ এম শাহাদাৎ হোসাইন জানান, ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশের নানামুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, জামিনপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে এবং সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও আতঙ্ক
শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিদেশ থেকে ফোনের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে এবং হুমকি দিচ্ছে। ভুক্তভোগীরা ভয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে পারছেন না। ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশার মানুষ তাদের শিকারে পরিণত হচ্ছেন। রাজধানীর ২০টি এলাকায় অর্ধশতাধিক সহযোগী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। চাঁদাবাজি শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বাজার, ফুটপাত, টেন্ডার দখল এবং বাড়ি দখলের মতো ঘটনাও ঘটছে। কোটি কোটি টাকা হুন্ডি করে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে সন্ত্রাসীরা বিলাসী জীবনযাপন করছে।
জামিনপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীদের তালিকা ও অপতৎপরতা
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জামিন পাওয়া সন্ত্রাসীদের অনেকেই দেশ ছেড়েছে, তবে কেউ কেউ ফিরে এসেছে বা ফেরার চেষ্টা করছে। সরকারের তালিকাভুক্ত অন্তত ছয়জন শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম (ইমন), খন্দকার নাঈম আহমেদ (টিটন) এবং খোরশেদ আলম (রাসু)। এদের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যেমন রায়েরবাজারে দুই যুবক হত্যা এবং এলিফ্যান্ট রোডে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে আক্রমণ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ ও সমন্বয়
সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দফায় দফায় বৈঠক করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সমন্বয় সভা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা কোর কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। সম্প্রতি কাফরুলে এক গার্মেন্ট কারখানায় চাঁদা দাবিতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় চার সন্ত্রাসী গ্রেফতার হয়েছে, যারা ‘ফোর স্টার’ গ্রুপের সদস্য বলে দাবি করা হয়েছে। র্যাব-৪ এর মিডিয়া অফিসার কেএন রায় নিয়তি জানান, গ্রেফতারকৃতরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক
ফার্মগেট-কাওরানবাজার এলাকায় বাদশাহ, আহাদ, সিদ্দিক প্রমুখ সন্ত্রাসীরা টেন্ডার দখল ও চাঁদাবাজি করছে। ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে ইব্রাহিম, মুন্না, কিলার জসিম প্রমুখেরা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। কিলার জসিম ১৮ বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছে এবং তার সহযোগী লেদু হাসান সক্রিয় রয়েছে। মোহাম্মদপুরে হত্যাকাণ্ডের হার বেশি, যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে আসাদুল হক ও ইমন হোসেন (এলেক্স ইমন) খুন হয়েছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা
২০০১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, কিন্তু গত ২৫ বছরে নতুন তালিকা করা হয়নি। বর্তমানে মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক ও কাফরুলে মফিজুর রহমান মামুন, শাহাদাত হোসেন (সাধু), কিলার আব্বাস ও ইব্রাহিম খলিল (কিলার ইব্রাহিম) প্রমুখ বিদেশ থেকে হুমকি দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, একটি শীর্ষ সন্ত্রাসী দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। টেন্ডার বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।



