পুলিশের ওপর হামলা বেড়েছে, নিরাপত্তাহীনতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
পুলিশের ওপর হামলা বেড়েছে, নিরাপত্তাহীনতায় বাহিনী

দিন কিংবা রাত, অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খবর পেলেই অভিযানে নামেন পুলিশ সদস্যরা। কিন্তু সম্প্রতি পরপর এমন কয়েকটি অভিযানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংঘবদ্ধ ও বেপরোয়া হামলার এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে বাড়ছে অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

সবশেষ গত বুধবার (১৩ মে) রাতেও এমন ঘটনার মুখোমুখি হন পুলিশ সদস্যরা। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে বাহিনীটির একটি টহল দল হামলার শিকার হয়। এতে পুলিশের এক সদস্য আহত হন। পরে অতিরিক্ত ফোর্স গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ঘটনাস্থল থেকে সাত জনকে আটক করে থানায় নেয়।

এর আগে সোমবার (১১ মে) রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টাউন হলের পেছনের আজম রোডের একটি গলিতে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে পুলিশের একটি দল হামলার শিকার হয়। পরে অভিযানে তিনজন দুর্বৃত্তকে গ্রেফতার করা হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাড়ছে হামলার সংখ্যা

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৮১৪টি। এর মধ্যে চলতি বছরের মাত্র চার মাসেই ঘটেছে ২১৩টি ঘটনা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, খোদ পুলিশ সদস্যরাই যদি নিরাপদ বোধ না করেন, তাহলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল থাকবে?

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা একটা অশনি সংকেত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যরাই হামলার শিকার হওয়ায় তাদের সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তারা পরিস্থিতির জন্য 'মব সংস্কৃতি'র বিস্তারকেও দায়ী করছেন এবং নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থানের পরামর্শ দিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান

পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে, ২০২৫ সালে সারাদেশে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ছিল ৬০১টি। এর মধ্যে মার্চ মাসেই সবচেয়ে বেশি ছিল। ওই মাসে ৯৬ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হন। অন্যান্য মাসে যেমন— জানুয়ারিতে ৩৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭টি, এপ্রিলে ৫২টি, মে'তে ৬২টি, জুনে ৪৪টি, জুলাইয়ে ৩৯টি, আগস্টে ৫১টি, সেপ্টেম্বরে ৪৩টি, অক্টোবরে ৬৯টি, নভেম্বরে ৪১টি এবং ডিসেম্বরে ২৯টি ঘটনায় পুলিশ হামলার শিকার হয়েছে।

চলতি বছরেও হামলার প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ২১৩টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৪২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি, মার্চে ৬৩টি এবং এপ্রিলে ৬৬টি হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতি মাসেই এই হামলার সংখ্যা বাড়ছে।

গত ১৬ মাসে বিভিন্ন মহানগর পুলিশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওপর— ১১২টি। সবচেয়ে কম হয়েছে আরপিএমপিতে— ৪টি। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) ওপর ৫৫টি, খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) ওপর ১২টি, রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) ওপর ১১টি, বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) ওপর ১৩টি, সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) ওপর ২১টি এবং গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) ওপর ৩১টি হামলার ঘটনা ঘটে।

রেঞ্জভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ঢাকা রেঞ্জে ১৭৬টি। সবচেয়ে কম বরিশাল রেঞ্জে— ২৭টি। অন্য রেঞ্জগুলোতে হামলার সংখ্যা— ময়মনসিংহে ৩৫টি, চট্টগ্রামে ১২৩টি, সিলেটে ৫৭টি, খুলনায় ৪৭টি, রাজশাহীতে ৬১টি এবং রংপুরে ৩৮টি ঘটনা ঘটে।

ছয় বছর আগেও বছরে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ছিল সাড়ে ৪৪০। ২০২০ সালে ৪৪৯টি, ২০২১ সালে ৬০৮টি, ২০২২ সালে ৬০১টি, ২০২৩ সালে ৬০৭টি এবং ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ৬৪৩ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হন।

বিশেষজ্ঞ মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, 'সাম্প্রতিক সময়সহ গত এক বছরে অসংখ্যবার পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। আইন প্রয়োগ করতে গেলে পুলিশ প্রায়ই বাধার মুখে পড়ছে।'

তিনি বলেন, 'অনেক ক্ষেত্রে মামলার আসামি করা বা এজাহার থেকে নাম বাদ দিতে পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এমনকি থানা থেকে আসামি ছাড়িয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেয়ে উল্টো পুলিশকে দোষারোপ করা হচ্ছে, যা তাদের নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।'

তার মতে, 'পুলিশের ওপর হামলায় রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। হামলাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।' তিনি আরও বলেন, 'হামলার পরপরই শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব হতো। অপরাধী যেই হোক, কোনও ছাড় নয়—এই বার্তা কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে হবে।'

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, 'কর্মক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।'

তিনি জানান, অনেক সময় দুই বা তিনজন সদস্য অভিযানে গিয়ে সংঘবদ্ধ হামলার মুখে পড়ছেন। এজন্য কৌশলগতভাবে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, 'বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এবং ইতোমধ্যে অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে।'