দেশের পরিকল্পনা প্রণয়নে পুরোনো ধারা থেকে বেরিয়ে এসে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও বাস্তবভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, “অতীতে দেশের অধিকাংশ পরিকল্পনা গ্রহণের পরদিন থেকেই ‘মৃত দলিল’-এ পরিণত হতো, কারণ সেগুলোর বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”
অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন কমিটির সভায় বক্তব্য
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাজধানীর শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন সংক্রান্ত কমিটির দ্বিতীয় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিতুমীর বলেন, “অতীতে স্বজনপ্রীতি ও পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন, অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে অর্থনীতি চাপে পড়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতামতের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।”
পূর্ববর্তী পরিকল্পনার কাঠামোগত দুর্বলতা
তিনি উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী পরিকল্পনা পদ্ধতিতে কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল প্রকট। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বারবার সংশোধন, সময়মতো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া এবং ‘জুন সিনড্রোম’-এর মতো প্রবণতা পুরো পরিকল্পনা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলেছিল।
নতুন কাঠামোয় চারটি বড় সংস্কার
নতুন পরিকল্পনা কাঠামোতে চারটি বড় সংস্কারের কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, “প্রথমত প্রকল্প নির্বাচন বা ‘প্রোগ্রামিং’ প্রক্রিয়া পুনর্গঠন করা হবে, যাতে তা জনরায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। তৃতীয়ত, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে, যাতে গবেষক, শিক্ষক ও নাগরিকরা প্রকল্পের বাস্তব চিত্র যাচাই করতে পারেন। আর চতুর্থত, পুরো প্রক্রিয়াকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করা হবে।”
তিনি বলেন, “জনগণের করের অর্থে পরিচালিত প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তথ্য উন্মুক্ত থাকলে সরকারের দাবি ও প্রকল্পের বাস্তব অর্জনের মধ্যে পার্থক্য নাগরিকরাই যাচাই করতে পারবেন, যা জবাবদিহি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।”
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য
উপদেষ্টা আরও জানান, নতুন অর্থনৈতিক কৌশলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে খাতভিত্তিক পরিকল্পনা, সুনির্দিষ্ট কৌশল এবং পরিমাপযোগ্য সূচক নির্ধারণের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, “অতীতে পরিকল্পনা কমিশন অনেক ক্ষেত্রে ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে কাজ করলেও এখন সেটিকে একটি কার্যকর নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোয় সামষ্টিক ও খাতভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।”
অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা প্রক্রিয়া
তিতুমীর দাবি করেন, নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়া পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক। অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের মতামতের ভিত্তিতে এ কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা, বার্ষিক পরিকল্পনা এবং পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা সংগ্রহ করে তা সমন্বিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “জনগণের ভোট ও নির্বাচনি ইশতেহার থেকে পাওয়া অগ্রাধিকারগুলোই এখন সরকারের অর্থনৈতিক এজেন্ডায় রূপান্তরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা হবে।”



