বগুড়ায় সাংবাদিক গ্রেফতার: ফৌজদারি মানহানি আইনের অপব্যবহারের নতুন উদাহরণ
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা যখন জোরেশোরে চলছে, তখন বগুড়ায় এক সাংবাদিকের গ্রেফতার সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। 'দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন' পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ রেজানুর ইসলামকে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মানহানির অভিযোগে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ফৌজদারি আইনের অপব্যবহার সাংবাদিকদের স্বাধীনতাকে কতটা হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সরকারের স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ
সরকার একটি 'স্বাধীন' গণমাধ্যম কমিশন গঠনের লক্ষ্যে 'ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান' তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। গত ১৮ জুন বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। মন্ত্রীদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলা হচ্ছে, সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর। নতুন কমিশনের দায়িত্ব থাকবে 'অপতথ্য' থেকে জনগণকে নিরাপদ রাখা, যা জনমনে স্বস্তির পাশাপাশি দুশ্চিন্তাও সৃষ্টি করছে।
প্রতিমন্ত্রীর মানহানি মামলা ও গ্রেফতার
বগুড়া প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ তানভীর আলম 'দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন'-এর সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। মামলায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের মানহানির অভিযোগ আনা হয়। সাইবার নিরাপত্তা আইনে করা এই মামলায় ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোহাম্মদ রেজানুর ইসলামকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম পরে বিবৃতি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং জানান, মামলায় তার কোনো অনুমোদন বা নির্দেশনা নেই। তবে তার প্রেস সেক্রেটারি স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, 'প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপিকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপতথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে।'
ফৌজদারি মানহানি আইনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ব্রিটিশ আমল থেকে বিদ্যমান বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৫০০, ৫০১ ও ৫০২ ধারা এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকদের মানহানির অভিযোগে গ্রেফতার ও জেলে পাঠানোর সুযোগ দেয়। এই আইনগুলোর কারণে ক্ষমতাধর ব্যক্তি নিয়ে রিপোর্ট বা মতামত লেখা সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৬ সালে দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় ৬৭টি মামলা করা হয়, যেখানে ৭১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়। এসব মামলা সাধারণত বিচার পর্যন্ত গড়ায় না, কারণ উদ্দেশ্য হয় হয়রানি করা।
ডিজিটাল যুগে 'নাগরিক সাংবাদিক' ও আইনের অপব্যবহার
ডিজিটাল যুগে শুধু মূলধারার সাংবাদিক নন, 'নাগরিক সাংবাদিক'রাও সাইবার নিরাপত্তা আইনের রোষানলে পড়ছেন। ফেসবুক স্ট্যাটাস বা সামাজিক মাধ্যমে কোনো বক্তব্য 'আপত্তিকর' মনে হলে এই আইন নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২২ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরা ইউটিউবে এক প্রবাসী অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারের সাক্ষাৎকার প্রচার করায় গ্রেফতার হয়ে এক বছরের বেশি সময় বিনাবিচারে কারাভোগ করেন।
অপতথ্য মোকাবিলা আইনের ঝুঁকি
তথ্যমন্ত্রী গণমাধ্যম কমিশন গঠনের সাথে 'অপতথ্য ও ভুল তথ্য' থেকে জনগণকে নিরাপদ রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তবে ব্রিটেন, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে অপতথ্য মোকাবিলা আইনের অপব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে। ২০২৩ সালে ব্রিটেনে ১২ হাজারের বেশি মানুষকে 'ঘৃণাসূচক' বা 'ভুয়া' তথ্য প্রচারের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, শুধু সহিংসতা উসকে দেয় বা ঘৃণার উদ্রেক ঘটায়—এমন মন্তব্যই নিষিদ্ধ করা উচিত।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা: বিচারের অভাব
গত দুই বছরে বাংলাদেশের দুই সরকারই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক নিরাপত্তার অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। প্রথম আলোর একটি ভবন ও দ্য ডেইলি স্টারের মূল ভবন উগ্রবাদী মব ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় পুড়িয়ে দেয়। ঘটনার ছয় মাস পরও নতুন বিএনপি সরকার প্রায় চার মাস ক্ষমতায় থাকলেও এই হামলার বিচার হয়নি। হামলাকারীরা দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালায়, ডেইলি স্টার ভবনে সাংবাদিক হত্যার চেষ্টাও করে। ঘটনার প্রচুর ভিডিও থাকা সত্ত্বেও তাদের ধরতে না পারা সরকারের গাফিলতি নয়, বরং সদিচ্ছার অভাবের প্রতিফলন।
সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
সাংবাদিক সমাজের নেতারা ও মানবাধিকার আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে মানহানির বিষয় ফৌজদারি আইন থেকে সরিয়ে দেওয়ানি আইনে সীমাবদ্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছেন। বগুড়ার ঘটনা সরকারকে এই দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তথ্যমন্ত্রী জহিরুদ্দিন স্বপন বলেছেন, তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে 'সবচেয়ে শক্তিশালী' একটি কমিশন গঠন করতে চান। তিনি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের অগ্নিসংযোগকারী মব বাহিনীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এবং সাংবাদিকদের মাথার ওপর থেকে ফৌজদারি আইনের খড়গ সরিয়ে নিয়ে প্রমাণ করতে পারেন যে সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে কতটা আন্তরিক।



