গৃহকর্মী নির্যাতন: শিক্ষিত-ধনীদের অপরাধ, বিচারহীনতা ও মানসিকতার পরিবর্তনের প্রয়োজন
গৃহকর্মী নির্যাতন: শিক্ষিত-ধনীদের অপরাধ, বিচারহীনতা ও মানসিকতার পরিবর্তন

বাংলাদেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্তরা সাধারণত শিক্ষিত, উচ্চপদস্থ ও ধনী ব্যক্তি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৯ বছরের রিক্তামণিকে ধানমন্ডির উঁচু ভবন থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। শিশুটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও ভাঙা হাত পাওয়া গেছে। এর আগে খুলনার সোনাডাঙ্গা থানার এএসআই দম্পতি গৃহকর্মী মিলন দাসের ওপর তরকারির বাটি পড়ে যাওয়ায় অমানুষিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। মিলনের মুখ ও শরীরে গরম কড়াইয়ের ছ্যাকা ও কান ধরে উঠ-বস করানোর প্রমাণ রয়েছে।

পরিবারে শেখা আচরণ ও দায়িত্বশীলতা

লেখক শাহানা হুদা রঞ্জনা তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তিনি ছোটবেলায় গৃহকর্মী নূরজাহানকে ধাক্কা দিলে তার বাবা-মা তাকে কঠোরভাবে বকা দেন এবং নূরজাহানের কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন। বাবা বলেছিলেন, “শুধু অভাবের কারণে অন্যের বাসায় কাজ করাটা খুব কষ্টের।” সেই শিক্ষা তাকে সারা জীবন অহিংস থাকতে শিখিয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের পারিবারিক শিক্ষা যেমন, আমরা সেরকম আচরণই শিক্ষা পাই।”

গৃহকর্মী নির্যাতনের পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-২০২৩ সালে মোট ১৮৯ জন গৃহকর্মী ধর্ষণসহ বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হন। অধিকারকর্মীরা মনে করেন প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি, কারণ অনেক ঘটনা মামলা পর্যন্ত গড়ায় না বা আপসে চাপা পড়ে যায়। প্রতি বছর কমপক্ষে ৩০-৪০টি ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। প্রায় ৯৫ শতাংশ গৃহকর্মী নারী, এবং ৮০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অর্ধেকের বেশি কোনো না কোনো ধরনের মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিচারপ্রাপ্তির হার অত্যন্ত কম

গত ১০ বছরে বাংলাদেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের মাত্র দুটি মামলায় পূর্ণাঙ্গ বিচার ও সাজা হয়েছে। চট্টগ্রামে ২০২৫ সালে এক গৃহকর্ত্রীকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ঢাকার শেওড়াপাড়ায় প্রায় ১৫ বছর পর ২০২৫ সালে এক গৃহকর্ত্রীকে ৫ বছরের কারাদণ্ড হয়। অধিকাংশ মামলা তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব, আপস ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে রায় পর্যন্ত পৌঁছায় না। ২০১৫ সালে “গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি” গৃহীত হলেও এটি পূর্ণাঙ্গ আইন নয় এবং বাস্তবায়ন দুর্বল।

প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন ও নিবন্ধিত নিয়োগ

লেখকের মতে, গৃহকর্মী নির্যাতন বন্ধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। গৃহকর্মীকে পরিবারের সদস্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, ক্রীতদাস নয়। নিবন্ধিত গৃহসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহকর্মী নিয়োগ দেওয়া উচিত। পাড়া-প্রতিবেশী ও গার্ডদেরও সচেতন হতে হবে, কারণ কোনো সহিংসতাই ব্যক্তিগত নয়। গৃহকর্মীরা যেমন নির্যাতনের শিকার হন, তেমনি তারাও নির্যাতন করতে পারেন—সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজ গড়তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আইনি সুরক্ষা জরুরি।