বছরের পর বছর ধরে অভিযান চালিয়েও ঢাকার কিশোর গ্যাংগুলো বারবার ফিরে আসছে। পুলিশ ও অপরাধবিদরা বলছেন, এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং পুনর্বাসন ও আইন প্রয়োগে গভীর ব্যর্থতার পরিচয়।
গ্রেফতার হলেও ফিরছে অপরাধে
পুলিশ জানায়, কিশোর গ্যাং সদস্যদের নিয়মিত গ্রেফতার করে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো বা জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তারা ফিরে গিয়ে নতুন নামে বা নতুন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক নিয়ে অপরাধ চালিয়ে যায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানায় বর্তমানে ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। সবচেয়ে বেশি গ্যাং মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকায়। এসব গ্যাং ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মাদক পাচার, কন্ট্রাক্ট কিলিং, জমি দখল ও খুনের মতো অপরাধে জড়িত।
অর্থ ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই মূল চাবিকাঠি
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু গ্রেফতার করে সমস্যার সমাধান হবে না। একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতার করলেই সমস্যা সমাধান হবে না, যতক্ষণ না তাদের অর্থায়নকারী, মাদক সরবরাহকারী, অস্ত্র সরবরাহকারী ও রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।”
ডিএমপি তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর বিভাগে সর্বোচ্চ ৩২টি গ্যাং সক্রিয়, যার মধ্যে ১৪টি শুধু পল্লবীতে। তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি গ্যাং রয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি মোহাম্মদপুর এলাকায়। রমনা, লালবাগ, ওয়ারী, মতিঝিল, গুলশান ও উত্তরা বিভাগেও ছোট ছোট নেটওয়ার্ক সক্রিয়।
কিশোরদের ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ
তদন্তকারীরা জানান, প্রতিটি গ্যাংয়ে সাধারণত ৭ থেকে ২০ জন সদস্য থাকে, যাদের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্করা তদারকি করেন। সদস্যরা ধারালো অস্ত্র ও কখনও কখনও আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে। মাদক সেবন ও পাচার এসব নেটওয়ার্কের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা আরও জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও গ্যাংগুলো টিকে আছে। তারা কেবল পৃষ্ঠপোষক পরিবর্তন করেছে। আগে যারা স্থানীয় এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে যুক্ত ছিল, তারা এখন নতুন ক্ষমতা কেন্দ্রের সাথে যুক্ত হয়েছে। আবার কেউ কেউ ছোট ছোট উপদলে ভাগ হয়ে গেছে, যারা এলাকা ও অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিযোগিতা করছে।
কিশোররা কীভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, কিশোর গ্যাং সদস্যরা “জন্মায় না, তৈরি হয়।” তিনি বলেন, কিশোররা ধীরে ধীরে মাদক বিতরণ, চাঁদাবাজি ও স্থানীয় দালালির মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং প্রভাবশালী অপরাধী নেটওয়ার্কের সুরক্ষায় গুরুতর অপরাধে অংশ নেয়।
শুধু পুলিশি ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন সামাজিক উদ্যোগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক সতর্ক করে বলেন, সমস্যা ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, শুধু পুলিশি ব্যবস্থায় এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; অর্থায়নকারী, মাদক সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরিবার, স্কুল ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভূমিকা জোরদার করতে হবে।
পুলিশও বর্তমান কৌশলের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, অনেক গ্যাং সদস্য নাবালক, যাদের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়, কিন্তু পরে তারা আবার অপরাধে ফিরে আসে। তিনি বিদ্যমান পুনর্বাসন কাঠামোর কার্যকারিতা পর্যালোচনার পরামর্শ দেন।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে মিছিল ও সহিংস বিক্ষোভে নাবালকদের ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, যতক্ষণ না কিশোরদের নিয়োগ ও শোষণকারী নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ পুরোনো গ্যাং ভেঙে দিলেও নতুন গ্যাং তৈরি হবে।



