হালান্ডের নরওয়ে বনাম ইংল্যান্ড: বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের চূড়ান্ত লড়াই
হালান্ডের নরওয়ে বনাম ইংল্যান্ড: বিশ্বকাপের লড়াই

বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ৩টায় মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের শেষ আটের লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে নরওয়ে ও ইংল্যান্ড। একদিকে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে, অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড।

পরিসংখ্যান ও ইতিহাস

দুই দল এর আগে সাতবার মুখোমুখি হয়েছে। ইংল্যান্ড জিতেছে পাঁচটি ম্যাচ, নরওয়ের জয় মাত্র একটিতে, আর একটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অতীতের পরিসংখ্যান খুব বেশি কাজে লাগে না। একটি গোল, একটি ভুল বা একজন খেলোয়াড়ের জাদুকরী মুহূর্ত সব হিসাব উল্টে দিতে পারে।

নরওয়ের রূপকথা

বিশ্বকাপ শুরুর আগে খুব কম মানুষই নরওয়েকে শেষ আটে কল্পনা করেছিলেন। ব্রাজিলকে হারিয়ে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছে। নরওয়ের কোচ স্টলে সোলবাকেন সেই জয়কে দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দিন বলে আখ্যা দিয়েছেন। ২৮ বছরের বিশ্বকাপ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুধু অংশ নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতে এসেছে তার দল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হালান্ডের নেতৃত্ব

রূপকথার কেন্দ্রবিন্দু আর্লিং হালান্ড। চলতি বিশ্বকাপে গোল তার নিত্যসঙ্গী। ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নরওয়েকে শেষ আটে তুলেছেন। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও তিনি অন্যতম শীর্ষে। সংবাদ সম্মেলনে হালান্ড বলেন, 'চাপ সব ইংল্যান্ডের ওপর। সবাই তাদের ফেভারিট বলছে। আমরা শুধু আমাদের ফুটবল খেলতে চাই।' তার বিশ্বাস, ভয়হীন ফুটবলই নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হালান্ডের ভাইকিং উদযাপন বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত দৃশ্য। নরওয়ের শহর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়াম সবখানেই এখন হালান্ড উন্মাদনা। তবে নরওয়ের শক্তি শুধু হালান্ড নন। অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডের সৃজনশীলতা, প্যাট্রিক বার্গের বুদ্ধিদীপ্ত মাঝমাঠ, আন্দ্রেয়াস স্কেলদেরুপের গতি দলটিকে আরও পরিণত করেছে। সাবেক ডিফেন্ডার ওডিন বিওরটুফট মনে করেন, নরওয়ের আসল শক্তি তাদের ঐক্য ও দলগত ফুটবল।

ইংল্যান্ডের অপেক্ষার অবসান

ইংল্যান্ডের গল্পটা অপেক্ষার। ১৯৬৬ সালের পর আর বিশ্বকাপ ট্রফি ছোঁয়া হয়নি। এবার সেই চক্র ভাঙতে চান থমাস টুখেল। জার্মান এই কোচ দায়িত্ব নেওয়ার পর ইংল্যান্ডের খেলায় এসেছে নতুন প্রাণ। আক্রমণাত্মক ফুটবলের পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তাও বেড়েছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে ১০ জন নিয়ে লড়াই করে জয় তুলে নিয়েছে ইংল্যান্ড, যাকে টুখেল 'নায়কোচিত পারফরম্যান্স' বলে বর্ণনা করেছেন। টুখেল বলেন, 'এই দলের হৃদয় আছে, বিশ্বাস আছে। প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা লড়তে জানে।'

ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনের কাছে বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়। ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'বিশ্বকাপের জন্যই আমরা বেঁচে থাকি। এই ট্রফিটাই প্রতিটি ফুটবলারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।' চলতি বিশ্বকাপেও কেইন দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। জুড বেলিংহামের সৃজনশীলতা, ডেকলান রাইসের নিয়ন্ত্রণ, বুকায়ো সাকার গতি, ফিল ফোডেনের কারুকাজ মিলিয়ে ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর।

বন্ধুত্ব বনাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা

ম্যাচের আরেকটি আবেগঘন গল্প জড়িয়ে আছে হালান্ড ও জুড বেলিংহামকে ঘিরে। একসময় বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে একসঙ্গে খেলেছেন দুই বন্ধু। এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একে অপরের প্রতিপক্ষ। বন্ধুত্ব ৯০ মিনিটের জন্য থেমে থাকবে, এরপর আবার ফিরে আসবে।

কৌশলগত লড়াই

কৌশলগত দিক থেকে ম্যাচটি হবে দুর্দান্ত। ইংল্যান্ড চাইবে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে। ডেকলান রাইস ও বেলিংহাম ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে নরওয়ের ওপর চাপ বাড়বে। নরওয়ের লক্ষ্য থাকবে দ্রুত বল জিতে ওডেগার্ডের পাসে হালান্ডকে খুঁজে বের করা। সবচেয়ে বড় লড়াই হবে ইংল্যান্ডের রক্ষণ বনাম হালান্ড। এক মুহূর্তের অসাবধানতা মানেই গোল। আবার জন স্টোনসরা যদি হালান্ডকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেন, তাহলে নরওয়ের আক্রমণ অনেকটাই ভোঁতা হয়ে যেতে পারে।

ইংল্যান্ডের তরুণ মিডফিল্ডার নিকো ও'রাইলি বলেছেন, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের অভিজ্ঞতা ইংল্যান্ডের বড় শক্তি। আগের দুই বিশ্বকাপের শিক্ষা এবার কাজে লাগাতে চায় দল। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নায়ক আর খলনায়কের ব্যবধান অনেক সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ড। একটি কর্নার, একটি হেড, একটি দুর্দান্ত সেভ কিংবা একটি ভুল পাস বদলে দিতে পারে কোটি মানুষের ভাগ্যের গল্প।

হয়তো আজ রাতেই হালান্ড নরওয়েকে প্রথমবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তুলবেন। হয়তো হ্যারি কেইন আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবেন তার আজীবনের স্বপ্নের দিকে। হয়তো জুড বেলিংহাম আবারও প্রমাণ করবেন, কেন তাকে ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ বলা হয়। আবার হয়তো টুখেলের ইংল্যান্ড লিখবে নতুন ইতিহাস। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে একটি দেশের আকাশ ভরে যাবে আনন্দের পতাকায়, অন্য দেশের স্টেডিয়াম ছেড়ে বের হবে নীরব মানুষ।