রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অবসান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বান মানবাধিকার সম্মেলনে
রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অবসান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বান

রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অবসান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বান

রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অবসান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দায়ীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও বিশিষ্টজনরা। তারা বলেছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার নিশ্চিত না হলে টেকসই মানবাধিকার সুরক্ষা সম্ভব নয়।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন

শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইসফানদিয়ার জাহান হাসান চৌধুরী মিলনায়তনে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আয়োজিত ১২তম জাতীয় মানবাধিকার সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। এ সময় সংগঠনের ২০২৫ সালের কার্যক্রম তুলে ধরেন প্রোগ্রাম অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম।

বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন উপস্থাপন

ডকুমেন্টেশন অফিসার আব্দুল কাদের ‘বাংলাদেশের বার্ষিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। একই পর্বে প্রোগ্রাম অফিসার সানী কুদরত সাকী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ক মনিটরিং প্রতিবেদন তুলে ধরেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তারা বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্তে প্রাণহানির মতো ঘটনা মানবাধিকার পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। কার্যকর তদন্ত ও বিচার না হওয়ায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্যানেল আলোচনা: রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা

সম্মেলনের বিশেষ অধিবেশনে ‘রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন: ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতার প্রশ্ন’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মো. নূর খান, সানজিদা ইসলাম ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বক্তব্য দেন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার নিহত ইশতিয়াক হোসেন জনির ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি এবং পুলিশের গুলিতে পা হারানো সাতক্ষীরার রুহুল আমিন নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। অধিবেশন সঞ্চালনা করেন ইজাজুল ইসলাম।

ভুক্তভোগীদের বক্তব্য ও দাবি

আলোচনায় ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা বলেন, বিচারহীনতা শুধু আইনি সংকট নয়, এটি পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক দুর্ভোগের কারণ। তারা সত্য উদ্ঘাটন, স্বাধীন তদন্ত, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং দায়ীদের বিচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। বক্তারা আরও বলেন, নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সীমান্তে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার

সম্মেলনের আরেকটি অধিবেশনে ‘সীমান্তে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মানবাধিকার কর্মী সাজ্জাদ হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ বক্তব্য দেন। এছাড়া সীমান্তে নিহত ফেলানী খাতুনের বাবা নুর ইসলাম এবং নিহত মুরসালিনের বড় ভাই ইয়াসিন মিয়া তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বক্তারা বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবিক নীতিমালার আলোকে পরিচালিত হতে হবে। অনিয়মিত অভিবাসন বা সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে কাউকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা কিংবা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্তে ফেরত পাঠানো মানবাধিকারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধে কার্যকর দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং মানবাধিকারভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

অতিথি বক্তৃতা ও প্রধান অতিথির বক্তব্য

সম্মেলনের অতিথি বক্তৃতা পর্বে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের বাংলাদেশ অফিসের মানবাধিকার কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক (যুগ্ম সচিব) ব্যারিস্টার মো. খলিলুর রহমান খান এবং অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, মানবাধিকার রক্ষা কোনও রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলার ওপরও তারা গুরুত্বারোপ করেন।

সমসাময়িক মানবাধিকার ইস্যু ও সমাপনী অধিবেশন

সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, কারাগারে মৃত্যু, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, শ্রম অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার মতো সমসাময়িক মানবাধিকার ইস্যু নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। সমাপনী অধিবেশনে দ্বিতীয় জাতীয় মানবাধিকার অলিম্পিয়াডের বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে এইচআরএসএসের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাদা আল আমিন কবির অংশগ্রহণকারী ও অতিথিদের ধন্যবাদ জানান।