মাজার হামলায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি: দেশজুড়ে সহিংসতার চিত্র
চব্বিশের আন্দোলন পরবর্তী সময় থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায় পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৯৭টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ শনিবার (১১ এপ্রিল) কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে ‘পীর’ শামীম রেজাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
মামলা ও তদন্তের বেহাল দশা
শতক ছুঁইছুঁই এই হামলাগুলোর বিপরীতে এখন পর্যন্ত কুষ্টিয়াসহ মাত্র ১২টি মামলা দায়ের হয়েছে। অধিকাংশ মামলার তদন্তে কোনও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, হয়নি উল্লেখযোগ্য কোনও গ্রেফতার। ফলে মাজার-কেন্দ্রিক এই সহিংসতায় এক ধরনের ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দৌলতপুরের ঘটনায় নিহত শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরের (৬৫) অনুসারীদের দাবি, একটি পুরনো ভিডিওর খণ্ডিত অংশ এডিট করে ‘কুরআন ও ধর্ম অবমাননা’র তকমা দিয়ে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই উসকানির জেরে একদল লোক তার মাজারে হামলা চালিয়ে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং মাজারটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এই ঘটনায় নিহতের ভাই চারজনের নাম উল্লেখসহ একটি হত্যা মামলা করেন, যেখানে জামায়াতে ইসলামী ও খেলাফত মজলিসের স্থানীয় নেতার নামও রয়েছে। তবে ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, “তদন্ত চলছে, তবে এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার হয়নি।”
মানবাধিকার সংস্থার তথ্য ও বিভাগভিত্তিক হামলা
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ১০০টিরও বেশি মাজার আক্রান্ত হয়েছে। এতে অন্তত ৩ জন নিহত এবং নারীসহ ২০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
সুফিবাদ নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’-এর প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু ঢাকা বিভাগেই ৫০টির বেশি মাজার আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে সর্বোচ্চ ১১টি এবং ঢাকায় ৯টি হামলা হয়েছে। এছাড়া কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও রাজবাড়িতে একাধিক হামলা হয়েছে। এসব হামলায় নারীসহ কমপক্ষে ১৮০ জন আহত ও অন্তত দুই জন নিহত হন। রাজবাড়ীতে ‘নুরা পাগলা’ নামক এক ব্যক্তির মৃতদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো বীভৎস ঘটনাও ঘটেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগেও সহিংসতার চিত্র ভয়াবহ। কুমিল্লায় ১৭টি, চট্টগ্রামে ৪টি, নোয়াখালিতে ৩টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২টি ও কক্সবাজারে ১টিসহ মোট ২৭টি মাজারে হামলা হয়েছে। সীতাকুণ্ড ও হাটহাজারীর বেশ কিছু ঐতিহাসিক মাজারও এই আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পায়নি।
ধামরাইয়ের ঘটনা: মামলা হলেও গ্রেফতার নেই
ঢাকার অদূরবর্তী ধামরাই উপজেলায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তিনটি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে তিনটি মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনও গ্রেফতারের খবর পাওয়া যায়নি। বর্তমানে একটি মাজারের কার্যক্রম পুনরায় চালু হলেও বাকি দুটি এখনও বন্ধ রয়েছে।
২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি ধামরাইয়ের গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের অর্জুন নালা এলাকায় শুকুর আলী শাহ ফকিরের মাজারে বার্ষিক ওরস চলাকালীন ‘ইসলামবিরোধী কার্যকলাপের’ দোহাই দিয়ে একদল স্থানীয় লোক প্রথমে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয় এবং পরে মাজারে ভাঙচুর চালায়। হামলায় দুটি মাজার ও একটি টিনশেড ঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং অন্য একটি স্থাপনা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পরদিন ২৪ জানুয়ারি ভুক্তভোগী পরিবার ১২ জনের নাম উল্লেখসহ ৭০০-৮০০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে।
এর আগে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ধামরাইয়ের সানোরা ইউনিয়নের বাটুলিয়া এলাকায় কালমপুর-সাটুরিয়া আঞ্চলিক সড়কের পাশে ‘বুচাই পাগলা’ মাজারে অজ্ঞাত পরিচয় হামলাকারীরা ভাঙচুর চালায়। এর প্রায় ছয় মাস পর ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি ঢাকার একটি আদালত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। এর পরদিন ১২ সেপ্টেম্বর রাতে ইসলামপুর এলাকায় ‘বরকত মা’ নামে পরিচিত আরেকটি মাজারেও ভাঙচুর চালানো হয়।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি
সাম্প্রতিক এক সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, বাটুলিয়ার বুচাই পাগলা মাজারের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কবর ও আশপাশের স্থাপনা মেরামত করা হয়েছে এবং বর্তমানে সেখানে কোনও নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মাজার কমিটির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, “পুলিশ দুইজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা নিলেও কাউকে গ্রেফতার করেনি। অথচ ভিডিও দেখে অনেককে শনাক্ত করা সম্ভব।” তিনি আরও বলেন, “আমরা মাজার সংস্কার করে কার্যক্রম শুরু করেছি, তবে আমরা এই অন্যায়ের বিচার চাই।”
অপরদিকে, ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও শুকুর আলী শাহ ফকিরের মাজারের ক্ষয়ক্ষতি এখনও অপূরণীয় রয়েছে। মাজারের খাদেম আক্কাস আলীর ভাতিজা মনোয়ার হোসেন বলেন, “আসামিদের নাম দিয়ে মামলা করেও কেউ গ্রেফতার হয়নি। এ বছর আমরা কোনও উৎসব ছাড়াই শুধু দোয়া ও তবারক বিতরণের মাধ্যমে ওরস পালন করেছি।” বর্তমান সরকারের কাছে বিচারের আশা করেন কিনা— এমন প্রশ্নে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “কীসের বিচার পাবো? বিচার করবেন কেবল আল্লাহ।”
ইসলামপুরের ‘বরকত মা’ মাজারে গিয়ে কোনও খাদেমের দেখা পাওয়া যায়নি। মাজারটি এখনও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে। ধামরাই থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শহিদুল ইসলাম বলেন, “মামলা হয়েছে কিন্তু কেউ গ্রেফতার হয়নি। তদন্ত চলছে। বর্তমানে কোনও মাজারেই নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই।”
বিশ্লেষকদের মতামত ও সরকারের প্রতিক্রিয়া
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় আদর্শিক বিরোধ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা, গুজব এবং স্থানীয় ক্ষমতার লড়াইয়ের সংমিশ্রণে এসব হামলার ঘটনা ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আবদুর রাজ্জাক খান বলেন, “তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান না হওয়া এবং দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের মনে বিচারহীনতার ধারণা তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।” তিনি পরিস্থিতি উত্তরণে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি গুজব প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সালাহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে প্রধান উপদেষ্টার তথ্য উপদেষ্টা জাহিদ-উর রহমান প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে বলেন, সরকার এসব ঘটনা প্রতিরোধে ব্যর্থতার দায় নিচ্ছেন এবং এ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন।



