জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংকট: পুরনো আইনে ফিরে যাওয়ায় উদ্বেগ
তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বানরের দুই হাত ওঠা ও নামার মতো বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অবস্থান এখন অত্যন্ত নাজুক। গণিতের ধাঁধার মতো এই কমিশনও যেন ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে, ভূপাতিত হওয়ার দশায় পৌঁছেছে। বর্তমান সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল পাস করে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইনে ফিরে গেছে, যার ফলে কমিশন সদস্যদের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে রহিত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
কমিশন সদস্যদের পদত্যাগ ও খোলাচিঠি
এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় কমিশনের সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন এবং সরকারের প্রতি একটি খোলাচিঠি লিখেছেন। চিঠিতে তারা সরকারের বক্তব্য খণ্ডন করে যুক্তি দিয়েছেন যে, সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন মানবাধিকার কমিশনের আইনগত স্বাধীনতা খর্ব করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে। তারা ২০০৯ সালের আইন পুনর্জীবিত না করে আরও শক্তিশালী আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।
মানবাধিকার কমিশনের ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রভাব
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন কোন রাজনৈতিক দলের এজেন্ডায় কখনোই ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সংগঠন ও মানবাধিকার ব্যক্তিরা একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী কমিশনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথম অধ্যাদেশ জারি করে, কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার নতুন আইন প্রণয়ন করে।
- ২০০৯ সালের আইনে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।
- পরবর্তীতে চেয়ারম্যানের পদ স্থায়ীভাবে আমলাদের দখলে চলে যায়, কমিশন হয়ে পড়ে অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের জন্য একটি রিওয়ার্ড সিস্টেম।
- সর্বশেষ চেয়ারম্যান ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব, যা সরকারের মনোভাব স্পষ্ট করে।
২০০৯ সালের আইন বনাম অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ
২০০৯ সালের আইনের বেশ কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
- বাছাই কমিটির গঠন: সাত সদস্যের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা স্বাধীনতা সীমিত করে।
- কমিশনের ক্ষমতা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা কমিশনের নেই।
- আর্থিক স্বাধীনতা: কমিশনের বাজেট আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে, ব্যবহারে স্বাধীনতা সীমিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে এই দুর্বলতাগুলো কিছুটা কাটানো হয়, যেমন বাছাই কমিটিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ হ্রাস, কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারও ব্যাপক আলোচনা না করে সামান্য সংশোধনী আনে, যা তাদের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
হঠাৎ নিয়োগ ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৫ সালের নভেম্বরে অধ্যাদেশ জারি ও দ্রুত সংশোধনীর মাধ্যমে বাছাই কমিটিতে আমলাতন্ত্রের প্রভাব বাড়ানো হয়। নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে নতুন সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যা কৌতূহলোদ্দীপক। সরকার দাবি করছে যে ২০০৯ সালের আইনে ফিরে যাওয়া একটি সাময়িক পদক্ষেপ এবং তারা শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করবে, কিন্তু বারবার বিশ্বাসভঙ্গের শিকার মানবাধিকারকর্মীরা এতে আস্থা রাখতে পারছেন না।
সর্বোপরি, একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার উভয়ই তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, যা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য হুমকিস্বরূপ।



