পাঁচ বছর পর হারানো সন্তানের সঙ্গে মিলন, প্রথম আলোর ফেসবুক পোস্টে সফলতা
রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় এক মর্মস্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। পাঁচ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সন্তান সাইদুলকে খুঁজে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন তার মা-বাবা। ছোট ভাই মিনহাজের উপস্থিতিতে এই মিলনমুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী।
ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে শুরু হয় খোঁজ
এই অসাধারণ মিলনের পেছনে কাজ করেছে প্রথম আলোর একটি ফেসবুক পোস্ট। গত সোমবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত এই পোস্টে বলা হয়েছিল, সাইদুল নামের এক শিশু বাড়ি ফিরতে চায়। তার ঠিকানা কুমিল্লার মুরাদনগর, তবে পূর্ণ ঠিকানা তার জানা ছিল না। পোস্টটিতে মা-বাবার নামও উল্লেখ করা হয়েছিল।
ফেসবুক পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার শেয়ার এবং শত শত মন্তব্য দেখা যায়। 'রোদেলা আকাশ' নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে মন্তব্য আসে যে, লেখক শিশুটিকে চিনেন। এই সূত্র ধরে যোগাযোগ করা হয় সাইদুলের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে।
কেমন ছিল সাইদুলের জীবন?
সাইদুলের সঙ্গে সাংবাদিকের পরিচয় হয়েছিল চার দিন আগে, ১২ এপ্রিল বিশ্ব পথশিশু দিবস উপলক্ষে একটি প্রতিবেদন তৈরির সময়। শিশুটি জানায়, ছোটবেলায় ভুলক্রমে ট্রেনে উঠে ঢাকায় চলে আসে। এরপর থেকে সে পথে পথে ঘুরে বোতল কুড়ানো এবং ভাঙারির দোকানে কাজ করেছে। শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণিতে একটি বটগাছের নিচে থাকত সে।
"ভাইয়া, আমি বাড়ি যামু। আমারে বাড়ি নিয়া যান" - এই আকুতি জানিয়েছিল সাইদুল সাংবাদিককে। সেই আকুতিই পরবর্তীতে প্রথম আলোর ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়।
পরিবারের নিরলস খোঁজ
সাইদুলের বাবা মোস্তফা কামাল একজন অটোরিকশা মিস্ত্রি এবং মা ফাতেমা আক্তার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। ছয় বছর বয়সে চট্টগ্রাম থেকে সন্তান হারানোর পর থেকে তারা নিরলসভাবে খোঁজ চালিয়েছেন। সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া, এলাকায় মাইকিং করা এমনকি কবিরাজের শরণাপন্ন হওয়া - সব পথই তারা অনুসরণ করেছেন।
মোস্তফা কামাল বলেন, "ছেলেকে ফিরে পাননি, তবে আশা ছাড়েননি কখনো।" তারা সবসময় বিশ্বাস করতেন একদিন না একদিন তাদের বড় ছেলে ফিরে আসবে।
আইনি প্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত মিলন
গতকাল মঙ্গলবার সকালে সাইদুলের মা-বাবা, ভাই-বোন এবং চাচা বোরহান উদ্দিন প্রথম আলো কার্যালয়ে আসেন। তারা শিশুটির টিকা কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র, পরিবারের সঙ্গে সাইদুলের ছোটবেলার ছবিসহ বিভিন্ন প্রমাণপত্র নিয়ে আসেন।
দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর পল্টন মডেল থানায় গিয়ে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান এবং শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মী শাহানাজ মনির উপস্থিতিতে সাইদুলকে তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলে যে, এ ধরনের প্রচেষ্টা সমাজের জন্য অনুকরণীয়।
মিলনের মুহূর্ত
পুরানা পল্টনে যখন সাইদুলের মা-বাবা তাকে দেখতে পান, তখন মা ফাতেমা দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে সন্তানকে জড়িয়ে ধরেন। শুরু হয় অবিরাম কান্না। কিছুক্ষণ পর বাবা মোস্তফাও তাকে জড়িয়ে ধরেন। পাঁচ বছর পর সন্তানকে ফিরে পেয়ে মা ফাতেমা বলেন, "জীবনেও ভাবেননি তাঁরা তাঁদের বড় ছেলেকে ফিরে পাবেন।"
সাইদুলের বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার দৃশ্যও ছিল মর্মস্পর্শী। সে তার পথশিশু বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে, হাত মিলিয়ে তাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়। থানায় বসেই ভিডিও কলে দাদির সঙ্গে কথা বলে সাইদুল, যে দাদি-দাদা কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে নাতির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন।
শেষ কথোপকথন
যাওয়ার আগে সাইদুলের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, মা-বাবাকে পেয়ে কেমন লাগছে। তার এক শব্দের উত্তর ছিল - "ভালো"। রিকশায় যাওয়ার আগে সে হাত নেড়ে বিদায় জানায়, মুখে ছিল স্বস্তির হাসি। সাইদুলের মা-বাবা গতকালই তাকে নিয়ে কুমিল্লায় নিজেদের গ্রামের বাড়িতে চলে যান।
এই গল্পটি শুধু একটি পথশিশুর পরিবারে ফেরার গল্পই নয়, বরং এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার এবং গণমাধ্যমের সামাজিক দায়িত্ব পালনের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রথম আলোর ফেসবুক পোস্ট এবং সাংবাদিকের নিরলস প্রচেষ্টা একটি পরিবারকে তাদের হারানো সন্তান ফিরে পেতে সাহায্য করেছে, যা আমাদের সমাজে আশা ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে।



