ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় চুরির অপবাদে কিশোরকে গাছে বেঁধে নির্মম নির্যাতন
ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলায় চুরির অপবাদে এক কিশোরকে গাছের সঙ্গে বেঁধে অমানবিক নির্যাতনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ইতিমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। সর্বশেষ সোমবার (১৩ এপ্রিল) গ্রেপ্তারদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন আলফাডাঙ্গা থানার ওসি মো. আবুল হাসনাত খান।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
শনিবার সকালে স্থানীয় দুজন যুবক ওই কিশোরকে তার নিজের ঘর থেকে বের করে বাড়ির পাশে একটি গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে মারধর শুরু করে। পরে এই নির্মম নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা গণমাধ্যম ও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভুক্তভোগী কিশোর মো. হোসাইন (১৫) আলফাডাঙ্গা উপজেলার পাঁচুড়িয়া ইউনিয়নের চর চান্দড়া এলাকার মৃত মোছেন শেখের ছেলে।
গ্রেপ্তারকৃত তিন ব্যক্তি হলেন- মো. ইয়াছিন শেখ (২২), মো. শাকিল শেখ (১৯) এবং বিল্লাল কাজী (৪৫)। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়, গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় ওই কিশোরকে নির্মমভাবে মারধর করা হচ্ছে। মারধরের তীব্রতায় সে অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে ‘অভিনয়’ করছে বলে অপবাদ দিয়ে পুনরায় আঘাত করা হয়।
স্থানীয়দের বর্ণনা ও পটভূমি
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নির্যাতনের শিকার কিশোর হোসাইন ঢাকার একটি ফার্নিচার কারখানায় কর্মরত ছিলেন এবং সম্প্রতি ছুটিতে বাড়ি ফিরেছিলেন। এসময় ওই কারখানায় একটি ড্রিল মেশিন চুরি যাওয়ার ঘটনা ঘটে। সেই চুরির ঘটনায় তাকে দায়ী করে চোরের অপবাদ দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে এই বর্বর নির্যাতন চালানো হয়।
ভুক্তভোগী কিশোর হোসাইন নিজেই জানান, “আমি ঢাকা থেকে বাড়ি আসার পরদিন আমাকে ঘরে আটকে রাখে। পরে গাছের সঙ্গে বেঁধে ইয়াছিন ও শাকিল আমাকে মারধর করে।” তার মা বানু বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলে ঢাকায় থাকে। সে বাড়িতে আসার পর ইয়াছিন, শাকিলসহ তিনজন আমার ছেলেকে মেরেছে।”
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনের ভূমিকা
স্থানীয় বাসিন্দা শাহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন ছেলেটিকে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে। জামা খোলার পর তার পিঠে মারপিটের স্পষ্ট দাগ লক্ষ্য করা যায়। অভিযোগ প্রসঙ্গে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. ফিরোজ শেখ বলেন, “বিল্লাল নামে একজন আমাকে খবর দিলে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে ছেলেটিকে পুলিশে দিতে বলি। কিন্তু কারো কাছে পুলিশের মোবাইল নাম্বার না থাকায় এবং আমি ব্যস্ত থাকায় ওই অবস্থায় রেখে চলে আসি। তবে আমার সামনে মারধর করা হয়নি।”
পাচুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. সাইফুর রহমান জানান, স্থানীয় মেম্বার আলমগীর হোসেনের মাধ্যমে ঘটনা জানতে পেরে তিনি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তার জিম্মায় আটকদের ছাড়িয়ে রাখেন।
পুলিশের পদক্ষেপ ও আইনি প্রক্রিয়া
এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা থানা ওসি মো. আবুল হাসনাত খান বলেন, “কিশোরকে গাছে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় ভিডিও পর্যালোচনা করে রাতেই তিনজনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি নিয়মিত মামলা হয়েছে। তাদের ওই মামলা গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।”
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরই দ্রুত তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নির্যাতনের শিকার কিশোর হোসাইনকে চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে এবং তার পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।



