দেশে মব ভায়োলেন্স থামছে না: সাম্প্রতিক ঘটনায় উদ্বেগ ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
মব ভায়োলেন্স থামছে না: সাম্প্রতিক ঘটনায় উদ্বেগ

দেশে মব ভায়োলেন্স থামছে না: সাম্প্রতিক ঘটনায় উদ্বেগ ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

গত দুই দিনের দুটি ঘটনা দেশে উদ্বেগজনক ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনির বাস্তবতা আবারও সামনে এনেছে। শনিবার (১১ এপ্রিল) কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তিকে ‘পীর’ পরিচয়ে প্রতারণা ও ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে, শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাজধানীর শাহবাগে ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামিতার অভিযোগ তুলে একদল নারী-পুরুষের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনাগুলো নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে: দেশে কি মব সহিংসতা থামছেই না?

ঘটনার ধারাবাহিকতা ও সরকারের বক্তব্য

এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে এমন সহিংস ঘটনার ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিকবার মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, দেশে ‘মব কালচার শেষ’ এবং আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। গত ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদেও তিনি বলেন, “আমরা বাকস্বাধীনতা ও সংগঠনের অধিকার নিশ্চিত করবো, তবে মবের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।”

বাস্তব চিত্র ও মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য

কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী সময়ে চুরি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিরোধসহ নানা কারণে গণপিটুনির ঘটনা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রাণহানি ঘটছে। কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও সংঘবদ্ধ জনতার উন্মত্ততা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: চারটি প্রধান চালিকাশক্তি

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা এবং অনলাইন গুজব—এই চারটি বিষয় মব সহিংসতা বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তাদের মতে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, গুজব প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই প্রবণতা রোধ করা কঠিন। অন্যথায় ‘মব ভায়োলেন্স’ ধীরে ধীরে আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরিসংখ্যান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “মব ভায়োলেন্স কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, না হলে সহিংসতা আরও বাড়বে।”

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, “একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা মৌলিক অধিকার। এ ধরনের বর্বর ঘটনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।” তিনি আরও বলেন, “মাজারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন ও মব সহিংসতা রোধে সরকারকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।”

তিনি আরও জানান, গত মার্চ মাসে সারাদেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ২৫টি মব সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ৩৮ জন আহত হয়েছেন। গত তিন মাসে দেশে মোট ৮৮টি ঘটনায় ৪৯ জন নিহত এবং ৮০ জন আহত হয়েছেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন

এছাড়া মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর গণপিটুনি বা মব সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৯৭ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২৮ জন।

পুলিশের বক্তব্য

পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, মব ভায়োলেন্স পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে—এটা বলা যাবে না। কিছু ঘটনা এখনও ঘটছে। তবে পুলিশ এসব ঘটনায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।