মব সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তি: বিচারহীনতায় কুষ্টিয়ায় পীর হত্যা
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় স্থানীয়ভাবে পরিচিত পীর শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে তার দরবারে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এই হামলা চালানো হয়। ঘটনাটি মব সন্ত্রাসের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে ঘটে যাওয়া এমন ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়ায় তা পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
বিচারহীনতাই মূল কারণ
লেখক ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, "আগের ঘটনাগুলোর বিচার হয়নি বলে আবার একই ঘটনা ঘটেছে।" তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, আগের মব হামলাগুলো তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার। তাঁর মতে, বিচার না করলে এসব ঘটনায় সরকারের সমর্থন রয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ১৯৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা ২০২৪ সালের ১২৮ জনের চেয়ে বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগও মনে করেন, বিচার না হওয়ায় নতুন ঘটনা ঘটার পথ তৈরি হচ্ছে।
পরিকল্পিত হামলা ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা
আনু মুহাম্মদ শাহবাগ ও কুষ্টিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাকে পরিকল্পিত বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "হামলা ছিল পরিকল্পিত, পুলিশ ছিল নিষ্ক্রিয়।" শাহবাগে হামলার সময় পুলিশ বসে ছিল এবং কুষ্টিয়ায় তাদের শক্ত অবস্থান দেখা যায়নি। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব সহিংসতা বাড়ার পেছনে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দায়ী।
তিনি আরও যোগ করেন, এই হামলাগুলো ফ্যাসিবাদী রাজনীতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধভাবে চালানো হচ্ছে, যা ভিন্ন চিন্তা, লিঙ্গ ও বিশ্বাসের মানুষের প্রতি হিংস্রতা বাড়াচ্ছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করার পাশাপাশি সরকারকে প্রচারাভিযান চালানোর পরামর্শ দেন তিনি।
অভ্যাসগত অপরাধে পরিণত হচ্ছে মব সন্ত্রাস
রেজাউল করিম সোহাগ ব্যাখ্যা করেন, বিচার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে আইনের হাতে সোপর্দ করলে যথাযথ বিচার হবে না। ফলে তারা নিজেরাই বিচারের নামে অপরাধে জড়াচ্ছে। গুজবের ভিত্তিতে মব সহিংসতা ঘটছে এবং একই গোষ্ঠী বারবার হামলা করায় তা অভ্যাসগত অপরাধে পরিণত হচ্ছে।
তিনি পুলিশের মনোবল দুর্বল হওয়া এবং সংখ্যাস্বল্পতার কথাও উল্লেখ করেন। ২০০ নাগরিকের জন্য একজন পুলিশ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে ৮০০ মানুষের বিপরীতে একজন পুলিশ দায়িত্বে রয়েছেন, যা অপরাধ বৃদ্ধির একটি কারণ। পুলিশকে শক্তিশালী করা এবং গুজব প্রতিরোধে স্থানীয় সরকারকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি।
সরকারের ভূমিকা ও আশা
নতুন সরকার মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সরকার গঠনের পরদিনই "মব কালচার শেষ" ঘোষণা করেছিলেন। এখন পর্যন্ত আশা করা যেতে পারে যে সরকার মবের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেবে।
রেজাউল করিম সোহাগও বিচার নিশ্চিত করে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোর উপর জোর দেন। তিনি সতর্ক করে দেন, এখনই ঘটনাগুলোকে আইনের আওতায় নিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করলে মব সহিংসতা আরও বাড়বে এবং দেশে অস্থিরতা তৈরি হবে।



