প্রেমিকের হাতে সালেহা বেগমের নৃশংস হত্যা: মাথা বিচ্ছিন্ন করে নদীতে ফেলা
সালেহা বেগম হত্যা: প্রেমিকের হাতে মাথা বিচ্ছিন্ন

প্রেমিকের হাতে সালেহা বেগমের নৃশংস হত্যা: মাথা বিচ্ছিন্ন করে নদীতে ফেলা

একটি অপহরণ মামলা এবং অপরদিকে একটি মাথাবিহীন লাশ উদ্ধারের ঘটনা। প্রথমে দুটি ঘটনাই আলাদা মনে হলেও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ সত্য। নিখোঁজ নারী সালেহা বেগম এবং ঝপঝপিয়া নদীতে ভেসে ওঠা বেওয়ারিশ লাশ আসলে একই ব্যক্তি। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, সালেহাকে হত্যার পর তাঁর মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।

নিখোঁজের পর মামলা ও তদন্তের সূচনা

সালেহা বেগমের বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ার সাজিয়াড়া গ্রামে। গত বছরের ১৯ আগস্ট তিনি নিখোঁজ হন। ঘটনার দুই মাস পর ১৮ অক্টোবর তাঁর ছেলে শামীম ফকির আদালতে অপহরণ মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। তদন্তের এক পর্যায়ে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর সালেহার প্রেমিক লালন গাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপরই অজ্ঞাতপরিচয় মাথাবিহীন নারীর লাশের সঙ্গে এই মামলার যোগসূত্র খুঁজে পায় পিবিআই।

প্রেমের সম্পর্ক ও ইন্দুরকানী রহস্য

সালেহা বেগম দীর্ঘদিন সৌদি আরব প্রবাসী ছিলেন এবং ২০২৩ সালে দেশে ফিরে আসেন। এরপর একই গ্রামের লালন গাজীর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রেমের টানে ঘর ছেড়ে আসা সালেহাকে হত্যায় জড়িত ছিলেন এই লালন গাজীই। তদন্তে জানা যায়, লালন ও সালেহা প্রায় এক বছর ধরে পিরোজপুরের ইন্দুরকানী এলাকায় স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন। ২০২৪ সালের জুন থেকে তারা সেখানে বসবাস শুরু করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঝপঝপিয়া নদীর অচেনা লাশ ও তদন্তের মোড়

তদন্ত কর্মকর্তা খুলনা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক রেজোয়ান আহমেদ বটিয়াঘাটা থানায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ২০ আগস্ট ঝপঝপিয়া নদী থেকে মাথাবিহীন এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। লাশের পরিচয় না জানায় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরে এই লাশের ছবি ও গয়না সালেহার ছেলে শামীম ফকিরকে দেখানো হলে তিনি প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেন। ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়, নদীর লাশ আর নিখোঁজ সালেহা একই মানুষ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রেপ্তার ও হত্যার বিস্তারিত

পিবিআইয়ের টানা ৪০ দিনের অনুসন্ধানের পর গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জের হালুয়ারঘাট এলাকা থেকে লালন গাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সালেহাকে হত্যা ও মাথা বিচ্ছিন্ন করার ভয়াবহ বর্ণনা দেন। এই হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করেছিলেন তাঁর মামাতো ভাই সিজার মোল্লা, যাকে গত ১ মার্চ ঢাকার হাতিরঝিল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

হত্যার কারণ ও পদ্ধতি

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানা যায়, সালেহা বিয়ের জন্য লালনকে চাপ দিতে থাকেন এবং বিয়ে না করলে পরিবারকে সব জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এ কারণে লালন হত্যার পরিকল্পনা করেন। ১৯ আগস্ট রাতে, প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যে, লালন সালেহাকে একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে যান। সিজার মোল্লা রশি এনে দিলে লালন সালেহার গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে লাশের পরিচয় গোপন করতে হাঁসুয়া দিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ভদ্রা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়, যা পরে ঝপঝপিয়া নদীতে ভেসে ওঠে।

অর্থ আত্মসাৎ ও আলামত গায়েব

তদন্তে আরও উঠে আসে, একসঙ্গে থাকার সময় সালেহার ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা তুলে নিয়েছিলেন লালন। হত্যার পর সালেহার ব্যবহৃত আসবাব ও জামাকাপড় সিজারের বাড়ির উঠানে পুঁতে রাখা হয়, যা পরে পিবিআই উদ্ধার করে। পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন বলেন, এই মামলার আলামত পরিকল্পিতভাবে গায়েব করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

এই ঘটনায় দুটি আলাদা মামলা ও একটি বেওয়ারিশ লাশের রহস্য উদঘাটন করে পিবিআই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কুশীলবদের গ্রেপ্তারে সক্ষম হয়েছে। সালেহা বেগমের হত্যা নারী নির্যাতন ও অপরাধের ভয়াবহ দিকটি সামনে এনেছে।