টিআইবির ক্ষোভ: বিচারক নিয়োগ ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলে গণতন্ত্রের বার্তা প্রশ্নবিদ্ধ
টিআইবির ক্ষোভ: অধ্যাদেশ বাতিলে গণতন্ত্রের বার্তা প্রশ্নবিদ্ধ

টিআইবির তীব্র প্রতিক্রিয়া: অধ্যাদেশ বাতিলে গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় বিষয়ক দুইটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের নামে স্থগিতের সুপারিশে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি এই তিনটি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের জোর দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন ও তথ্য অধিকারবিষয়কসহ স্থগিতের সুপারিশপ্রাপ্ত অন্যান্য অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে অবিলম্বে আইনে পরিণত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

শুক্রবার (৩ এপ্রিল) এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যে গুটিকয়েক ক্ষেত্রে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছিল, তার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ অন্যতম। এই তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল ও স্থগিতের মাধ্যমে সরকার আসলে কী বার্তা দিতে চায়?” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহারে ‘বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, বিচারব্যবস্থা সংস্কারের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করা হবে’ বলে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, এই কী তার নমুনা?”

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও যোগ করেন, “বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বিচার বিভাগ কতটা কলুষিত ও বিরুদ্ধ মত দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, তা এত অল্প সময়ের ব্যবধানে সরকার ভুলে গেলো! যা খুবই হতাশাজনক।” তিনি সতর্ক করে দেন যে, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ স্থগিত হওয়ায় একটি কার্যকর কমিশন গঠনের সম্ভাবনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, যা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মঘাতী অবস্থান

নির্বাহী পরিচালক বলেন, “মানবাধিকার কমিশন ও বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত বিধানের অভাবে মানুষের জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে, তা ক্ষমতাসীন দলের প্রধানসহ কর্তাব্যক্তিদের বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। একই সঙ্গে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলের জন্য এ অবস্থান আত্মঘাতীমূলক।” তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক দলগুলো প্রায় সবাই বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার কমিশনের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণের মাধ্যমে অকার্যকরতার ফলে অধিকার হরণের শিকার হয়েছেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান জোর দিয়ে বলেন, “যদি তারা কর্তৃত্ববাদ ও রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে কোনও শিক্ষা গ্রহণ করে থাকেন, তবে অধ্যাদেশগুলো হুবহু বিল আকারে অবিলম্বে সংসদে অনুমোদনের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে দেশবাসীকে তার প্রমাণ দেওয়া উচিত।” তিনি গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলোর যাচাই-বাছাই নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “আইনে কোনও অর্ন্তনিহিত দুর্বলতা থাকলে সেটি অবশ্যই দূর করা যেতে পারে, কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ের নামে গুম খুনের সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলোকে সুবিধা বা দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা শুধু আত্মঘাতীই হবে না বরং দেশে কার্যকর মানাবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে পেছনে হাঁটার শামিল।”

দুদক, পুলিশ ও তথ্য কমিশন সংস্কারের আহ্বান

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশের প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুদক সংস্কার কমিশনের যেসব সুপারিশের ক্ষেত্রে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিসহ জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেগুলোর আলোকে দুদক অধ্যাদেশটি সংশোধন করে অবিলম্বে বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের আহ্বান জানাই।” তিনি দুদকের স্বাধীনতার জন্য একটি স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি সৃষ্টির বিধান অন্তর্ভুক্ত করার উপর জোর দেন।

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “পুলিশকে একটি জনবান্ধব ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠন প্রয়োজন তার কোনও প্রতিফলনই অধ্যাদেশটিতে হয়নি।” একইসঙ্গে, তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ সংশোধন করে একটি কার্যকর তথ্য কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

টিআইবি শেষে সব স্থগিত অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে আইনে পরিণত করার জোর দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলে মত প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।