ভাসমান মানুষের জন্য 'ভাসমান কার্ড': একটি মানবিক পরিচয় ও সহায়তার উদ্যোগ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্র নাগরিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করেছে। বাংলাদেশেও প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচিত ওয়াদা অনুযায়ী গত ১০ মার্চ ২০২৬ থেকে দেশব্যাপী প্রান্তিক পরিবারগুলোর জন্য ডিজিটাল 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচি শুরু হয়েছে। পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল ২০২৬) থেকে চালু হচ্ছে কৃষক কার্ড, এবং হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষক ও সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সহায়তা সহজলভ্য করার চেষ্টা চলছে।
ভাসমান মানুষ: সুবিধার বাইরের জনগোষ্ঠী
তবে সমাজে এমন একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা এসব সুবিধার বাইরেই থেকে যায়—তারা হলো ভাসমান মানুষ। রাস্তায় বসবাসকারী, ফুটপাতে ঘুমানো, রেল স্টেশন, বাস স্ট্যান্ড কিংবা পার্কে রাত কাটানো মানুষদের অনেকেরই কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, এমনকি অনেকের পরিচয়ও অনিশ্চিত। কেউ হয়তো পরিবার হারিয়েছে, কেউ দারিদ্র্য বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারিয়ে শহরে এসে আশ্রয়হীন হয়েছে। আবার অনেক শিশু রয়েছে, যারা এতিম বা পথশিশু হিসেবে বেড়ে উঠছে। রাষ্ট্রের প্রচলিত সেবা ও সহায়তা পাওয়ার জন্য সাধারণত জাতীয় পরিচয়পত্র, স্থায়ী ঠিকানা বা পারিবারিক পরিচয় প্রয়োজন হয়, যা এই ভাসমান মানুষের কাছে নেই। ফলে তারা খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত থাকে।
'ভাসমান কার্ড' কী এবং কীভাবে কাজ করবে?
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র যদি ‘ভাসমান কার্ড' নামে একটি বিশেষ পরিচয়পত্র চালু করে, তবে এই মানুষগুলোকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে এনে তাদের মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে। লক্ষণীয় যে, দেশের শহর, নগর ও বাজারে প্রতিদিন অসংখ্য ভাসমান ভিক্ষুককে দেখা যায়। কেউ শারীরিকভাবে অক্ষম, কারো হাত বা পা নেই, আবার কেউ নানা রোগ বা দারিদ্র্যের কারণে কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। তারা রাস্তার মোড়ে, সিগন্যালের পাশে বা ফুটপাতে গাড়ির কাছে গিয়ে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করে। এ ধরনের মানুষের জন্য সরকার ‘ভাসমান কার্ড' খুবই প্রযোজ্য, এতে একদিকে যেমন প্রকৃত অসহায় মানুষদের সহায়তা করা সহজ হবে, অন্যদিকে ভিক্ষাবৃত্তির অপব্যবহারও কমে আসবে।
ভাসমান কার্ড মূলত এমন একটি পরিচয়ভিত্তিক সেবা কার্ড হতে পারে, যা রাস্তার মানুষ, গৃহহীন ব্যক্তি, পথশিশু কিংবা যাদের স্থায়ী আবাসন নেই, তাদের জন্য বিশেষভাবে প্ৰণয়ন করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্র তাদের একটি অস্থায়ী কিন্তু স্বীকৃত পরিচয় প্রদান করতে পারে। ভাসমান কার্ডের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি হতে পারে সহজ ও মানবিক। উদাহরণস্বরূপ, সিটি করপোরেশন, সমাজসেবা অধিদপ্তর বা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিশেষ জরিপ পরিচালনা করে রাস্তার মানুষদের তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। মোবাইল টিম বা সামাজিক কর্মীরা রেল স্টেশন, লঞ্চঘাট, পার্ক, ফুটপাত ও বস্তি এলাকায় গিয়ে তাদের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে তাদের আঙুলের ছাপ বা ছবি সংরক্ষণ করা যেতে পারে, যাতে একই ব্যক্তি একাধিকবার নিবন্ধিত না হয়। এরপর তাদের একটি 'ভাসমান কার্ড' দেওয়া যেতে পারে, যেখানে একটি ইউনিক নম্বর থাকবে। এই কার্ডের মাধ্যমে তারা নির্দিষ্ট খাদ্যসহায়তা, অস্থায়ী আশ্রয়, চিকিৎসা সুবিধা, পুনর্বাসন কর্মসূচি কিংবা কর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগ পাবে। এভাবে ভাসমান কার্ড কেবল একটি পরিচয়পত্রই নয়, বরং একটি পুনর্বাসন ও মানবিক সহায়তার সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারে।
ভাসমান কার্ডের সম্ভাব্য সুবিধাসমূহ
ভাসমান কার্ড চালু হলে সমাজে নানা ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। প্রথমত, এটি গৃহহীন মানুষদের রাষ্ট্রের নজরে আনবে এবং তাদের সমস্যাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। বর্তমানে অনেক ভাসমান মানুষ পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যায়, ফলে তাদের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা কঠিন হয়। ভাসমান কার্ড চালু হলে একটি ডাটাবেস তৈরি হবে, যার মাধ্যমে সরকার জানতে পারবে দেশে কতজন গৃহহীন মানুষ রয়েছে এবং তারা কোথায় বসবাস করছে। দ্বিতীয়ত, এই কার্ডের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। যেমন নির্দিষ্ট রেশন বা কমমূল্যের খাদ্য বিতরণ কর্মসূচির আওতায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রাস্তার মানুষদের অনেকেই অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ কিংবা মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকে। ভাসমান কার্ড থাকলে তারা সরকারি হাসপাতাল বা মোবাইল ক্লিনিক থেকে সহজে চিকিৎসা নিতে পারবে। চতুর্থত, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার হবে। অনেক সময় ভাসমান মানুষ অপরাধ বা নির্যাতনের শিকার হয়, কিন্তু পরিচয় না থাকায় তারা ন্যায়বিচার পায় না। ভাসমান কার্ড তাদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় দেবে, যা আইনগত সুরক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে। এছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে এই উদ্যোগ তাদের পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
যদিও ভাসমান কার্ড একটি মানবিক উদ্যোগ, এর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, ভাসমান মানুষদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে, কারণ তারা প্রায়ই স্থান পরিবর্তন করে এবং তাদের স্থায়ী ঠিকানা থাকে না। দ্বিতীয়ত, অনেকের পরিচয় বা জন্মতারিখ জানা না থাকায় তথ্য সংগ্রহে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তৃতীয়ত, কিছু ক্ষেত্রে অপব্যবহার বা জালিয়াতির সম্ভাবনাও থাকতে পারে, যেখানে অন্য কেউ ভাসমান মানুষের পরিচয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এসব সমস্যার সমাধানের জন্য প্রযুক্তি ও সামাজিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করলে জালিয়াতি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সমাজকর্মীদের সম্পৃক্ত করা গেলে প্রকৃত ভাসমান মানুষদের শনাক্ত করা সহজ হবে। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পুলিশ প্রশাসন এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে একটি পদক্ষেপ
একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। যারা পরিবার, ঠিকানা বা সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই জীবন যাপন করে, তারা রাষ্ট্রের সবচেয়ে অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। ‘ফ্যামিলি কার্ড”, ‘ফার্মার কার্ড' এবং 'হেলথ কার্ড' যেমন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য কল্যাণমূলক উদ্যোগ, তেমনি ভাসমান মানুষের জন্য 'ভাসমান কার্ড' চালু করা হলে তা হবে মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে গৃহহীন মানুষদের পরিচয়, খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং তারা ধীরে ধীরে মূলধারার সমাজে ফিরে আসার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি এটি রাষ্ট্রকে একটি সুসংগঠিত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ যদি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখে, তবে ভাসমান মানুষের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাই সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, এনজিও এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভাসমান কার্ডের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা কেবল কিছু মানুষের জীবনই বদলাবে না, বরং পুরো সমাজকে আরো ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক করে তুলবে।
লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



