মহান স্বাধীনতা দিবস: গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার
স্বাধীনতা দিবস: গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার

মহান স্বাধীনতা দিবস: ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস, একটি গৌরবময় দিন যা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করে। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মোড় হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এই স্বাধীনতার জন্য লাখো মানুষ জীবন দিয়েছেন, অসংখ্য মা-বোন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এবং জাতি হিসেবে আমাদের আত্মত্যাগের গল্প বিশ্বে অনন্য স্থান দখল করে আছে।

বীর সন্তানদের স্মরণ ও স্বাধীনতার আদর্শ

স্বাধীনতার এই দিনে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই বীর সন্তানদের, যাঁরা দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করেছেন। বিশেষভাবে স্মরণ করি শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি ধীরে ধীরে একটি জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং সে পথে তাদের এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী জাতীয় চার নেতা এবং জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করা হয়, যাঁর বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণা সে সময় দিশাহারা জনগণকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যা আমাদের সংবিধানে আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য নিশ্চিত করার কথা বলে।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর: অর্জন ও চ্যালেঞ্জ

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এর পেছনে সুশাসনের ঘাটতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতাও। স্বাধীনতার পর থেকে যেসব রাজনৈতিক দল দেশ শাসনের ভার নিয়েছে, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলস্বরূপ গণ–আন্দোলন ও গণ–অভ্যুত্থান আমাদের ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে। ২০২৪ সালে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির কারণ হয়ে উঠেছিল কর্তৃত্ববাদী শাসন, জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যূথবদ্ধ সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলটিও নাগরিকদের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। তবে চব্বিশের জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার বড় সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতাতেই অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি পরিচ্ছন্ন, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দুই–তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।

নতুন সরকারের উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতি

দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকার ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড চালু, খাল খনন কর্মসূচিসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইনের শাসনের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সরকারি দল ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে একটি কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছেন। নাগরিক সমাজ এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে লক্ষ রাখবে, বিশেষ করে যেহেতু এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের অবজ্ঞা ও অস্বীকৃতিই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

একটা ভেঙে পড়া অর্থনীতি ঠিক পথে আনা এবং প্রশাসন, আদালত, দুদক, নির্বাচন কমিশনসহ দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্ষম করে তোলার মতো বড় চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের সামনে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং মূল্যস্ফীতির চাপ সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসাটাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজার অস্থির হয়ে পড়ায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এসব বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আমরা মনে করি, সব মত ও পথের মানুষের অধিকার সমুন্নত করাটাই সামাজিক ঐক্য ও স্থিতিশীলতা অর্জনের সবচেয়ে ভালো উপায়। একটি কার্যকর ও টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সংবিধানে বর্ণিত প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এবারের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার হোক গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করা, এবং স্বাধীনতা দিবস সবার জন্য সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানাই।