২৫ মার্চ গণহত্যা: ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিজ্ঞার দিন
২৫ মার্চ গণহত্যা: ইতিহাস বিকৃতি ও জাতীয় প্রতিজ্ঞা

২৫ মার্চ: বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনির্বাণ অধ্যায়

২৫ মার্চ, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই তারিখটি কেবল একটি দিন নয়— এটি এক জাতির অস্তিত্বের আর্তনাদ, এক গভীর অন্ধকার থেকে উঠে আসা আলোর প্রতিশ্রুতির সাক্ষী। এই রাতকে ভুলে যাওয়া মানে নিজের শিকড়কে অস্বীকার করা, নিজের জন্মকথাকে অস্বীকার করার সামিল। তাই ২৫ মার্চের গণহত্যা আমাদের ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়, যা কোনও প্রপাগান্ডা, কোনও অপপ্রচার বা রাজনৈতিক সুবিধাবাদের মাধ্যমে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

১৯৭১ সালের সেই ভয়াল রাতের বাস্তবতা

১৯৭১ সালের সেই ভয়াল রাত— যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে এক পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে, তা ছিল কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, ছিল একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার সুস্পষ্ট নীলনকশা।

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ঢুকে ঘুমন্ত ছাত্রদের হত্যা
  • শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে নিধন
  • রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ
  • পুরান ঢাকার অলিগলিতে সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি

সব মিলিয়ে এই রাত মানবতার ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায় হয়ে আছে। এই হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতা বোঝার জন্য কেবল পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। এটি ছিল মানুষের ওপর মানুষের বর্বরতার এমন এক রূপ, যেখানে কোনও বয়স, কোনও পরিচয় বা কোনও নিরপরাধিত্ব কাউকে রক্ষা করতে পারেনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইতিহাস বিকৃতির বর্তমান সংকট

কিন্তু আজ, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর, আমরা এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি। এক শ্রেণির মানুষ— কখনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, কখনও অজ্ঞতা থেকে, আবার কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে— মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে খাটো করার, বিকৃত করার বা প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  1. তারা কখনও ২৫ মার্চের গণহত্যাকে 'অতিরঞ্জিত' বলে দাবি করে
  2. শহীদের সংখ্যাকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে
  3. মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে জাতিকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে

এই প্রবণতা নিছক মতপার্থক্য নয়, এটি একটি গভীরতর সংকটের ইঙ্গিত। কারণ যখন একটি জাতির ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, তখন সেই জাতির আত্মপরিচয়ই হুমকির মুখে পড়ে।

জাতীয় দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

ইতিহাসের সত্যকে রক্ষা করা কেবল ইতিহাসবিদদের কাজ নয়, এটি প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। ২৫ মার্চের স্মৃতি আমাদের কেবল শোকাহত করে না, আমাদের দায়বদ্ধও করে। আমরা যদি এই ইতিহাসকে যথাযথভাবে লালন না করি, যদি আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে এর প্রকৃত তাৎপর্য তুলে ধরতে ব্যর্থ হই, তাহলে ইতিহাসবিরোধী শক্তি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে: ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর নানা দেশে, নানা সময়ে, ক্ষমতাসীন বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধামতো ইতিহাসকে পুনর্লিখনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সত্যই টিকে থাকে। কারণ ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়— এটি মানুষের স্মৃতিতে, সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে, গান-কবিতায় এবং সবচেয়ে বড় কথা, একটি জাতির সম্মিলিত চেতনায় জীবিত থাকে।

২৫ মার্চ: শোক নয়, প্রতিজ্ঞার দিন

আজকের প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চকে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। এটি শুধু অতীতের একটি ঘটনা নয়— এটি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যখন আমরা দেখি ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা কিংবা সত্যকে আড়াল করার প্রবণতা বাড়ছে, তখন ২৫ মার্চ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কতটা জরুরি।

সবশেষে বলতে হয়, ২৫ মার্চ কোনও কেবল শোকের দিন নয়, এটি প্রতিজ্ঞার দিন। এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— আমরা কাদের উত্তরসূরী, কী ত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীনতা পেয়েছি, এবং সেই ইতিহাস রক্ষার দায়িত্ব আমাদের ওপরই বর্তায়। এই ইতিহাসকে কেউ মুছে ফেলতে পারবে না। কারণ এটি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়— এটি আমাদের আত্মার গভীরে খোদাই করা সত্য।