অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উদ্বেগ: অনলাইন অপতথ্য বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে
বাংলাদেশে অনলাইন অপতথ্য, উসকানিমূলক কনটেন্ট এবং এর ফলে বাস্তব জীবনে সংঘটিত সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা যদি বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে দেশে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই উদ্বেগ যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ আমরা গত কয়েক বছর ধরে বারবার প্রত্যক্ষ করে আসছি।
অপপ্রচার থেকে বাস্তব সহিংসতা: একটি বিপজ্জনক প্রবণতা
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে দেশের শীর্ষ দুটি সংবাদমাধ্যম—প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার কয়েক মাস আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার এবং হামলার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তখন ফেসবুকের নিজস্ব অ্যালগরিদম সেই উত্তেজনাকর কনটেন্টকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। ফলে অনলাইনের ঘৃণা দ্রুতই রাজপথের মব ভায়োলেন্সে রূপ নেয়, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।
বাইরে থেকে আসা উসকানিমূলক কনটেন্ট: জননিরাপত্তার হুমকি
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব উসকানিমূলক কনটেন্টের একটি বড় অংশ আসছে দেশের বাইরে থেকে, বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত থেকে। রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি, সাম্প্রদায়িক বিভেদ উসকে দেওয়া এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করে ছড়ানো এসব অপতথ্য জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মেটা বা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে যে ধরনের ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, তার ঘাটতি বারবার পরিলক্ষিত হচ্ছে। অ্যামনেস্টি সতর্ক করে বলেছে, ডিজিটাল জগতের এই ক্ষতি শুধু স্ক্রিনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বিষাক্ত করে এবং বাস্তব জীবনে প্রাণহানি ও অস্থিরতা তৈরি করে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
মেটার দায়িত্ব ও সরকারের ভূমিকা: সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান
আমরা মনে করি, কেবল মুনাফার দিকে নজর না দিয়ে মেটাকে অবশ্যই বাংলাদেশের মতো সংবেদনশীল বাজারের জন্য তাদের মডারেশন ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। স্থানীয় ভাষা, রাজনীতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝেন—এমন দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট শনাক্ত ও দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করা তাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারকেও কেবল নিয়ন্ত্রণের দিকে না তাকিয়ে ডিজিটাল লিটারেসি বা অনলাইন সচেতনতা বাড়াতে কাজ করতে হবে, যাতে ব্যবহারকারীরা অপতথ্য চিনতে ও প্রতিরোধ করতে পারেন।
সময় থাকতেই কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন
অনলাইনের ঘৃণা যখন মানুষের ঘর পোড়ানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন নিশ্চুপ থাকার সুযোগ নেই। সময় থাকতেই মেটা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে। অন্যথায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের অধিকার রক্ষার বদলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভাগাড়ে পরিণত হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত মেটার সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করা। এ–সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা গ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি, যাতে ডিজিটাল অপরাধ দমন ও নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।



