তুরস্কে সাংবাদিক গ্রেফতার: প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ছেলের দুর্নীতি প্রতিবেদনের অভিযোগ
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের ছেলে বিলাল এরদোয়ানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান করায় দেশটির প্রখ্যাত সাংবাদিক ইসমাইল আরিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রবিবার রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে 'ভুল তথ্য ছড়ানোর' অভিযোগে ৩০ বছর বয়সী এই সাংবাদিককে আটক করে তুর্কি কর্তৃপক্ষ। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এই খবর নিশ্চিত করেছে।
সাহসী প্রতিবেদনের জন্য পরিচিত ইসমাইল আরি
বামঘরানা সরকারবিরোধী দৈনিক পত্রিকা বিরগুন-এ কর্মরত ইসমাইল আরি সরকারি দুর্নীতি, সংগঠিত অপরাধ এবং কট্টরপন্থি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর যৌন কেলেঙ্কারি নিয়ে সাহসী প্রতিবেদনের জন্য সুপরিচিত। তাকে গ্রেফতারের এই ঘটনা তুরস্কের বিরোধী মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এর আগে নিজ শহর তোকাত-এ পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটাতে গিয়েই তাকে আটক করা হয়।
প্রেসিডেন্ট পরিবারের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ
ইসমাইল আরি তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছিলেন যে, প্রেসিডেন্টের ছেলে বিলাল এরদোয়ান তার বাবার প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক আয়া সোফিয়া মসজিদটি একটি ব্যক্তিগত সভার জন্য বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ২০২১ সালের সেই ঘটনার তিনি প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন বলেও দাবি করেন।
এ ছাড়া বিরগুন টিভিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিলাল এরদোয়ান, তার বোন সুমাইয়া এবং তাদের মা এমিনে এরদোয়ান ২০টিরও বেশি অলাভজনক ফাউন্ডেশনের একটি 'সাম্রাজ্য' নিয়ন্ত্রণ করছেন। এসব সংস্থা সরকারি ব্যাংক থেকে অনুদানসহ নানা সুবিধা পেয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কভিত্তিক তুর্কেন নামক এমন একটি ফাউন্ডেশনের নাম সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের দুর্নীতি মামলাতেও উঠে এসেছিল।
মাদ্রাসা জমি দখলের প্রতিবেদন ও গ্রেফতার
ধারণা করা হচ্ছে, গত ১০ মার্চ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনই ইসমাইল আরির ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে একটি মাদ্রাসা (ইমাম হাতিপ লিসেসি) সরকারি জমি দখল করে হোস্টেল নির্মাণ করেছে। গত ৬ মার্চ সেই কাজের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে বিলাল এরদোয়ান সশরীরে উপস্থিত ছিলেন।
কারাগার থেকে পাঠানো এক বার্তায় ইসমাইল আরি বলেন, 'বিগত এক বছর ধরে কর্তৃপক্ষ আমাকে গ্রেফতারের অজুহাত খুঁজছিল। এই দেশে সাংবাদিকতা করাই আমার একমাত্র অপরাধ।'
তুরস্কে সাংবাদিকদের ওপর চাপ বৃদ্ধি
প্যারিসভিত্তিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর তুর্কি প্রতিনিধি ইরোল ওন্দেরোগ্লু জানান, তুরস্কে দুর্নীতিবিরোধী সাংবাদিকদের ওপর চাপের মাত্রা এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের অপমান বা ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে সাংবাদিকদের নিয়মিত হয়রানি করা হচ্ছে। ডয়চে ভেলের সাংবাদিক আলিকান উলুদাগকেও গত ফেব্রুয়ারিতে একই ধরনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানিয়েছে, যারা সরাসরি প্রেসিডেন্টের পরিবার বা বিচার বিভাগের দুর্নীতির দিকে আঙুল তুলছেন, তাদের লক্ষ্য করেই এই দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। ইস্তাম্বুলের মেয়র একরাম ইমামোগলুর মামলার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক বিদেশি সাংবাদিকও দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।
হুমকি ও পূর্ববর্তী ঘটনা
ইসমাইল আরি তার ২০২৪ সালের একটি বইয়ে তুরস্কের প্রভাবশালী ধর্মীয় গোষ্ঠী মেনজিল-এর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের তথ্য ফাঁস করার পর থেকে বেশ কয়েকবার হত্যার হুমকিও পেয়েছিলেন। এই ঘটনাগুলো তুরস্কে মিডিয়া স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।



