সালিশে চোর সাব্যস্ত করে নির্যাতন: গলাচিপায় এক নারীর আত্মহত্যা
সালিশে চোর সাব্যস্ত করে নির্যাতন, নারীর আত্মহত্যা

সালিশে চোর সাব্যস্ত করে নির্যাতন: গলাচিপায় এক নারীর আত্মহত্যা

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় চুরির অপবাদে সালিশ বৈঠকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এক নারী গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। রোববার সকালে উপজেলার সদর ইউনিয়নের উত্তর চরখালী গ্রামে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

আত্মহত্যাকারী সেলিনা বেগম (৫০) দীর্ঘদিন ধরে স্বামী পরিত্যক্তা হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে ছেলে ও পুত্রবধূ নিয়ে বসবাস করতেন। মাস দুয়েক আগে বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য উচ্ছেদ হয়ে পাশের একটি ঝুপড়িতে আশ্রয় নেন। সম্প্রতি তিনি পাশের বাড়ির আল আমীন মাস্টারের ঘরের বারান্দায় রাত কাটাতেন।

মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ওই ঘর থেকে আলমগীর মাস্টারের স্ত্রীর ১২ আনা স্বর্ণ ও ৪ ভরি রুপার গহনা হারানোয় আলমগীর ও তার পরিবার সেলিনা বেগমকে সন্দেহ করেন। ওই দিন সন্ধ্যায় স্থানীয় লোকজন সিরাজুল সিকদারের বাড়িতে সালিশ বৈঠক ডাকে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সালিশ বৈঠকের ভয়াবহতা

সেলিনার ছেলে ইফাজুল ইসলাম (২২) অভিযোগ করেন, "সালিশ বৈঠকে জসিম খান, রিয়াজ খান, নেওয়াজ সিকদার, মিজান সিকদার, শামীম সিকদারসহ ৪-৫ জন আমার মাকে মারধর করে চাল পড়া খাওয়ায়ে স্বীকারোক্তি নেয়। ৩শ টাকার স্ট্যাম্পে আমার মা, আমার স্ত্রী ও আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়।"

প্রত্যক্ষদর্শী নুরজাহান বেগম (৫৫) জানান, "সিকদার বাড়ির লোকজন সেলিনাকে মারধর করে এবং প্লাস দিয়ে নখ তুলে ফেলার ভয় দেখায়।"

ওই এলাকার বাসিন্দা মোশারফ মুন্সি (৫৫) বলেন, "দীর্ঘদিন যাবত সেলিনা অন্যের বাড়িতে কাজকর্ম করে ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাতেন। কখনো শুনিনি বা দেখিনি তিনি চুরি করেছেন।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আত্মহত্যার করুণ পরিণতি

সেলিনার পুত্রবধূ সারমিন আক্তার জানান, "আমরা পাশের বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলাম। ভোর পৌনে ৬টার দিকে শাশুড়ি আমার স্বামীর ফোনে মিস কল দেন। ফোনে টাকা না থাকায় আমরা ঘরে এসে দেখি তিনি মারা গেছেন। সালিশদারদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চুরি হওয়া সোনা-রুপা আজকে দেওয়ার কথা ছিল। আমার শাশুড়ি চুরির অপবাদ সইতে না পেরে গ্যাস ট্যাবলেট খেয়েছেন।"

সালিশদার সিরাজুল সিকদার ৩শ টাকার স্ট্যাম্প রাখার কথা স্বীকার করলেও দাবি করেন, "সেলিনাকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি।"

চুরির শিকার আলমগীর মাস্টার বলেন, "১৭ মার্চ থেকে আমার স্ত্রীর গহনা হারিয়েছে। আমি স্থানীয় লোকজনকে বিষয়টি জানালে তারা সেলিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেলিনা চুরির বিষয় স্বীকার করেন এবং আজকে মালামাল ফেরত দেওয়ার কথা ছিল।"

পুলিশের তদন্ত ও ব্যবস্থা

গলাচিপা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ঝিলন সিকদার জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পটুয়াখালী মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে সালিশ বৈঠক সম্পর্কিত অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে।

এই ঘটনা গলাচিপা এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা সালিশ নামক প্রথার অপব্যবহার এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ঘটনাটির তদন্ত ও দোষীদের বিচারের দাবি তুলেছেন।