কুমিল্লার তনু হত্যা মামলার এক দশক: বিচারহীনতার বেদনায় মা-বাবার কান্না
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান ওরফে তনুর মা আনোয়ারা বেগমের কণ্ঠে ক্ষোভ ও বেদনা মিশে আছে। গত বুধবার দুপুরে মুঠোফোনে তিনি বলছিলেন, ‘তারেক জিয়া বিদ্যাশ থাইক্কা আওনের আগেও কইছে, বিএনপি ক্ষমতায় আইলে মাইনষে ন্যায়বিচার পাইব। আমার মাইয়াডারে মারার ১০ বছর হইলো, এহনো তো বিচারডা হইলো না। তাইলে আমরা ন্যায়বিচারডা কবে পামু? এই জীবনে আর কিছু চাই না, শুধু মাইয়াডার খুনিডির বিচার দেখতাম চাই। যদি নতুন সরকার বিচার না করে, তাইলে বুইজ্জাম গরিবের কোনো বিচার নাই।’
এক দশকেও তদন্তে অগ্রগতি নেই
আজ শুক্রবার সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের এক দশক পূর্তি ঘটছে। দেশজুড়ে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পূর্ণ হলেও মামলাটির তদন্তে আজও তেমন অগ্রগতি হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে তদন্তে অগ্রগতি বলতে শুধুই ‘তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন’ ছাড়া কোনো আশার কথা শোনেনি সোহাগীর পরিবার। বিচার তো দূরের কথা, দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে শনাক্ত হয়নি খুনিরাও।
তদন্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সোহাগীর পরিবারসহ কুমিল্লার সচেতন নাগরিকেরা। তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ১০ বছরে চারটি তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন আর ৬ বার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন ছাড়া তদন্তে কোনো আশার আলো দেখতে পাননি তাঁরা। বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে সর্বশেষ গত বছরের এপ্রিলে কথা হয়েছে তাঁদের। মামলাটির দায়িত্ব পাওয়ার সাত মাস পর গত বছরের ৭ এপ্রিল কুমিল্লায় এসেছিলেন বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা। এর পর থেকে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই পরিবারের। মামলাটির বর্তমানে কী অবস্থা, সেটাও তারা জানে না।
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) রাজধানীর কল্যাণপুরের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম। গত বুধবার দুপুরে তরিকুল মুঠোফোনে বলেন, ‘পরিবারের দাবি সঠিক নয়। গত বছরের এপ্রিলের পরে তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েকবার কথা হয়েছে। যখন প্রয়োজন হয়- তখন আমরা যোগাযোগ করছি। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি।’
মামলাটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা তরিকুল বলেন, ‘তদন্তের কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা এরই মধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। আগামী ৬ এপ্রিল আমরা কুমিল্লার আদালতে যাব। আমাদের কাজ চলমান রয়েছে। পিবিআই সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে দ্রুত আসামিদের শনাক্ত করার জন্য।’
তদন্তের ইতিহাস ও পরিবারের হতাশা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার শুরুতে থানা পুলিশ, পরে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং তারপরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটির তদন্ত করেও কোনো কূলকিনারা করেনি। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর এই হত্যা মামলার নথি পিবিআই, ঢাকার সদর দপ্তরে হস্তান্তর করে সিআইডি। প্রায় চার বছর মামলাটি তদন্ত করেছেন পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। তিনিও পূর্বের তদন্ত কর্মকর্তাদের পথে হেঁটে অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মামলাটির ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছেন পরিদর্শক তরিকুল। কিন্তু এখনো তদন্তে কোনো আলোর মুখ দেখাতে পারেননি তিনি।
গত বুধবার সোহাগীর ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গত বছরের এপ্রিলের পর আমাদের সঙ্গে একবারের জন্যও যোগাযোগ করেননি তদন্ত কর্মকর্তা। আমরা যে কী অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেটা একমাত্র আল্লাহ ভালো জানেন। আমার অসুস্থ মা ও বাবা কান্না করে চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন। কিন্তু আমরা আজ পর্যন্ত তদন্তের অগগ্রতি দেখছি না। গত ১০ বছরে মামলার অগগ্রতি বলতে শুধুই তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হতে দেখেছি।’
আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, ‘আগামীকাল শনিবার ঈদ। কিন্তু আমাদের পরিবারে ঈদের আনন্দ নেই। ১০ বছর অনেক সময়, কেন আমার বোনের খুনের বিচার হলো না, এই জবাব আমাদের কে দেবে?’
মায়ের আকুতি ও ঘটনার পটভূমি
মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার একটামাত্র মেয়ে ছিল তনু। মেয়েটাকে অনেক আদরে লালন-পালন করেছি। কারা আমার মেয়েকে খুন করেছে আর ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, এটা দেশের মানুষ জানে। কিন্তু প্রশাসন খুনিদের সামনে আনছে না। সবার জন্য বিচার সমান হবে, এটা বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার। আমরা দেখতে চাই, খুনিদের বিচার এই সরকারের আমলে হয় কি না। মৃত্যুর আগে শুধু একটাই আশা, সেটা হচ্ছে মেয়ের খুনের বিচারটা দেখে যাওয়া।’
প্রসঙ্গত ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি সোহাগী। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে তাঁর লাশ পাওয়া যায়। তাঁকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। পরদিন তাঁর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর মৃত্যুর কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য জানায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ।
এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের শেষ ভরসা ছিল ডিএনএ রিপোর্ট। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তাঁর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। এ ছাড়া তাঁর মায়ের সন্দেহ করা তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তবে ওই সময় তাঁদের নাম গণমাধ্যমকে জানায়নি সিআইডি।



