সাংবাদিক আনিস আলমগীরের জেলজীবনের বর্ণনা: ভুয়া মামলা ও কারাগারের নির্মমতা
আনিস আলমগীরের জেলজীবন: ভুয়া মামলা ও কারাগারের নির্মমতা

সাংবাদিক আনিস আলমগীরের জেলজীবনের নির্মম অভিজ্ঞতা

প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক আনিস আলমগীর তাঁর গ্রেপ্তার ও জেলজীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন কীভাবে তাঁকে ভুয়া মামলায় আটক করা হয়েছিল এবং কারাগারের ভেতরে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

গ্রেপ্তারের মুহূর্ত ও ডিবি কার্যালয়ের ঘটনা

আনিস আলমগীর বলেন, "তারা জিম পরিদর্শনের নাম করে এসেছিল। আমি যখন বের হচ্ছিলাম, তখন তাদের দেখে মবের ঘটনার মতো মনে হচ্ছিল।" তিনি ব্যাখ্যা করেন যে ডিবি প্রধান তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছে বলে জানানো হলে তিনি বুঝতে পারেন গ্রেপ্তার হতে যাচ্ছেন। পরে তিনি জানতে পারেন, সেদিন সকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নির্দেশে তাঁর গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর গতিবিধি ট্র্যাক করা হচ্ছিল।

ডিবি কার্যালয়ে ও পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহ

ডিবি কার্যালয়ে তাঁকে কয়েক ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছিল, কিন্তু কোনো মামলা না থাকায় তারা নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করছিল। রাত একটার দিকে একটি সাজানো মামলা আসে। আনিস আলমগীর বলেন, "আমি ডিবি প্রধানকে বললাম, যেই অভিযোগগুলো আমার বিরুদ্ধে দিয়েছে, সেসব বক্তব্য অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে যায়।" তবে পরবর্তীতে সাজানো মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

তাঁকে একটি নির্জন রুমে নিয়ে যাওয়া হয়, যা ছিল অন্ধকার এবং মশায় ভরা। পাশেই নালা থাকায় মশা ও নালার গন্ধে সারা রাত ঘুমানো সম্ভব হয়নি। প্রায় ২৪ ঘণ্টা এই অবস্থায় কাটানোর পর তাঁকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ফিরে আসার পর তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে রাখা হয়। সব মিলিয়ে সাত দিন সেখানে কাটানোর পর তাঁকে কেরানীগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়।

কারাগারের ভেতরের জীবন ও পরিবেশ

কাশিমপুর কারাগারে তাঁকে এমন একটি জায়গায় রাখা হয়েছিল যেখানে কয়েক শ লোক এক রুমে থাকত। পরে মধুমতি ভবনের একটি কক্ষে স্থানান্তরিত করা হয়, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ছিলেন। আনিস আলমগীর বলেন, "পুরো জেলখানাভর্তি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, যাদের বেশির ভাগের পদপদবিও নেই।"

মধুমতি ভবনে প্রথম এক মাস খুবই খারাপ কাটে। একটি কক্ষে ৩৫ জন লোক থাকত, শোবার জায়গা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ঘুমানোর পরিবেশও ছিল না। কারাগারের ভেতরে যে কয়টি ভবনে আওয়ামী লীগের লোকজনকে রাখা হয়েছিল, সেটি যেন জেলখানার মধ্যে আরেকটি জেল ছিল। অন্য ওয়ার্ডের বন্দীরা বাইরে ঘুরতে পারলেও তারা পারত না।

এক মাস পর যখন তাঁকে ডিভিশন দেওয়া হয়, তখন থাকা-খাওয়ার কিছুটা উন্নত পরিবেশ ছিল, কিন্তু সেখানেও নির্জনতা বেশি ছিল। সেখানে ১৪-১৫ জন ছিলেন, যাদের মধ্যে কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। তবে ডিভিশনেও ভবনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না, যা তাঁকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দিয়েছে।

খাবার ও শৌচাগারের অবস্থা

মধুমতিতে থাকাকালীন খাবার জঘন্য ছিল, যা তিনি খেতে পারেননি। কেনা খাবারের ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু তার মানও ভালো ছিল না। ডিভিশনে আসার পর তাঁরা বরাদ্দকৃত খাবারের পাশাপাশি কিছু টাকা দিয়ে তা উন্নত করে খেতেন। টয়লেটের অবস্থা ছিল আরও ভয়াবহ। ২৫-৩৫ জন লোক একটি টয়লেটে যাওয়ার জন্য লাইন ধরে থাকতে হতো। পানিও নিয়মিত আসত না, দিনে দু-তিনবার আসত এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যেত।

মামলা ও আইনগত বিষয়

আনিস আলমগীর দাবি করেন, সন্ত্রাস দমন আইনে তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাটি সম্পূর্ণ ভুয়া। তিনি বলেন, "এর থেকে চরম নির্যাতনমূলক আইন এবং চরম ভুয়া মামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর হয়নি। প্রতিটি মামলার সঠিক বিচার করতে গেলে এগুলো একটাও টিকবে না।"

দুদকের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি জমি বিক্রির ট্যাক্স দেওয়ার আগেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি মনে করেন, ভুয়া মামলার সমালোচনা চলার সময় তাঁকে ডিফেম করার জন্য দুদককে লাগানো হয়েছে।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গ

আনিস আলমগীরের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে বেশি। তিনি বলেন, "ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনে প্রথম আলো সবচেয়ে টার্গেটেড পত্রিকা ছিল।" তিনি উল্লেখ করেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা বাংলাদেশের সংবাদপত্রের অন্ধকার যুগের সূচনা করেছে।

রাজনৈতিক অভিযোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

কেউ কেউ তাঁকে আওয়ামী লীগের দোসর বলে অভিহিত করলে তিনি এটিকে দুঃখজনক ঘটনা বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "কারও সমালোচনা করলে ধরে নেওয়া হয়, আমি অন্য পক্ষের লোক।" ভবিষ্যতে রাজনীতি করলে তিনি প্রকাশ্যে করবেন বলে জানান, গুপ্ত রাজনীতির দরকার নেই।

বর্তমানে তিনি ফ্রিল্যান্সিং, কনসালটেন্সি ও শিক্ষকতা করছেন। কারাগারে নেওয়ার পর তিনি কখনো ভয় পাননি বলে দাবি করেন এবং সত্য কথা বলতে তিনি কখনো ভয় পাবেন না বলেও জানান। তিনি দলীয় দালালি ছাড়া দলনিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।