কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন মা-মেয়ে
কক্সবাজারের পেকুয়া থানায় মা-মেয়েকে নির্যাতনের অভিযোগে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলমকে আদালত তলব করেছেন। গতকাল সোমবার কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিউল আযমের আদেশে ওসিকে আগামী ১৬ মার্চের মধ্যে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। এই ঘটনায় মা রেহেনা মোস্তফা (৪২) ও মেয়ে জুবাইদা বেগম (২১) কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং তাঁদের দেহে আঘাতের চিহ্ন সাংবাদিকদের দেখিয়েছেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা বাতিল ও মুক্তি
গত বুধবার বিকেলে পেকুয়া থানায় ডেকে নিয়ে রেহেনা ও জুবাইদাকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। পরে ওই দিন থানার ভেতরেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে দুজনকে এক মাস করে সাজা দেন পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল আলম। এরপর মা-মেয়েকে কক্সবাজার কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তবে গত শনিবার বিকেল ৪টার দিকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলমের আদালত ভ্রাম্যমাণ আদালতের সেই সাজা বাতিল করে মা-মেয়েকে বেকসুর খালাস দেন।
মামলা ও তদন্তে অনিয়মের অভিযোগ
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুবাইদার জন্মের পর রেহেনা ও তাঁর স্বামীর বিচ্ছেদ হয়। ২০১৩ সালে ২৩ মে জুবাইদার বাবার মৃত্যু হলে সম্পত্তির ভাগের জন্য চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। কিন্তু তাঁরা জুবাইদাকে অস্বীকার করেন। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা করেন জুবাইদা। আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয় পেকুয়া থানাকে। মামলার তদন্তভার যায় উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব কুমার ঘোষের কাছে।
স্বজনদের অভিযোগ, এসআই পল্লব তদন্ত প্রতিবেদন দিতে রেহেনা ও জুবাইদার কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে তাঁকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। টাকা নেওয়ার পরও আদালতে জুবাইদার বিপক্ষে প্রতিবেদন দেন তিনি। এতে টাকা ফেরত চেয়ে এসআই পল্লবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেন রেহেনা ও জুবাইদা। তবে টাকা ফেরত না দেওয়ায় গত ১৩ জানুয়ারি এ বিষয়ে তাঁরা কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
থানায় নির্যাতন ও ইউএনওর ভূমিকা
রেহেনার অভিযোগ, ‘টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে বুধবার আমাদের থানায় ডেকেছিল পুলিশ। আমি ও আমার মেয়ে থানায় গেলে পুলিশ আমাদের প্রচণ্ড মারধর করে। মারধরের পর থানায় ইউএনও আসেন। আমরা তাঁকে পুলিশের নির্যাতনের কথা বলি। তখন আমরা মনে করেছিলাম, ইউএনও স্যার আমাদের রক্ষা করতে এসেছেন। কিন্তু উনি আমাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখার পরও কিছু না বলে ওপরে (ওসির রুমে) চলে যান। ঘণ্টা দেড়েক পর সেখান থেকে নেমে যে যার মতো তাঁরা (ইউএনও-ওসি) চলে গিয়েছেন। এরপর পুলিশ আমাদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হচ্ছে বলে একটি কালো গাড়িতে তুলে নেয়।’
আদালতের তদন্ত ও নির্দেশনা
এসব ঘটনা নিয়ে প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর আমলে নেন আদালত। আদালতের আদেশে বলা হয়, ‘ঘটনার প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনগত ব্যবস্থা, থানায় রুজুকৃত জিডি বা মামলা, অভিযুক্তদের আটক করার কারণ এবং পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য উপস্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ১৬ মার্চের মধ্যে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হলো। ব্যাখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিডি বা মামলা, গ্রেপ্তার–সংক্রান্ত নথি, ডিউটি রোস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি সংযুক্ত করারও নির্দেশ দেওয়া হলো।’
বিষয়টি নিশ্চিত করে কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির এম এ ই শাহজাহান নূরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘মা-মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনায় গতকাল আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আগামী ১৬ মার্চের মধ্যে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।’
