গাজীপুরে মাদ্রাসা ছাত্রকে হত্যার নৃশংস ঘটনা: গাঁজা সেবনের দৃশ্য দেখার জের
গাজীপুরে এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গাঁজা সেবনের দৃশ্য দেখে তা অন্যকে বলে দেওয়ার হুমকির জেরে ১৩ বছর বয়সী মাদ্রাসা ছাত্র শিশু মাহাবুব ইসলাম রনিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে আগুনে পুড়িয়ে দেয় এক যুবক। পুলিশের তদন্তে এই ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটিত হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন)।
ঘটনার বিবরণ ও গ্রেপ্তার
গ্রেপ্তারকৃত আসামি ছাব্বির আহম্মেদ (১৯) গাজীপুর সদর উপজেলার ভবানীপুর ফকিরা গার্মেন্টস সংলগ্ন এলাকায় হাজী ইকবাল হোসেনের বাড়ির ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করছিল। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থানার নিজতুলন্দর দেওয়ানগঞ্জ বাজার এলাকায়। বৃহস্পতিবার (৫ বৃহস্পতিবার) রাতে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর থানার ভবানীপুর এলাকা থেকে ছাব্বিরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শুক্রবার বিকালে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই বিশ্বজিৎ বিশ্বাস জানান, মাহাবুব ইসলাম রনি ভবানীপুরর পূর্বপাড়া এলাকায় খুরশিদিয়া মারকাজুল উলুম কওমী মাদ্রাসা ও এতিমখানার নাজেরা বিভাগে অধ্যয়নরত ছিল। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে জয়দেবপুর ভবানীপুর পূর্বপাড়া দারুস সালাম জামে মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় করে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পরে রনি বাসায় ফিরে না আসায় তার পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পায়নি।
মরদেহের সন্ধান ও শনাক্তকরণ
পর দিন বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে খবর পায় যে; ভবানীপুর পূর্বপাড়া এলাকায় জঙ্গলের ভেতরে আগুনে পোড়া অবস্থায় ১৩/১৪ বছর বয়সের এক কিশোরের মরদেহ পড়ে আছে। পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত আগুনে পোড়া অবস্থায় মরদেহটি দেখে স্বজনরা মাহাবুব ইসলাম রনিকে শনাক্ত করেন। পরে এই ঘটনায় নিহত কিশোর রনির দাদা বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন।
পিবিআই মামলাটির তদন্ত করে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় জয়দেবপুর থানাধীন ভবানীপুর এলাকা হতে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঘটনা সঙ্গে জড়িত ছাব্বির আহম্মেদ গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে এ ঘটনার সঙ্গে নিজে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের এসআই বিশ্বজিৎ বিশ্বাস।
আসামির স্বীকারোক্তি ও পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে পিবিআই গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, নিরপরাধ একটি শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার মতো নৃশংস অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে পুলিশকে জানায়- ঘটনার দিন রাত অনুমান ৯টার ছাব্বির আহম্মেদ গাঁজা সেবনের জন্য জঙ্গলের ভেতরে যায়। সে পূর্বেও মাঝে মাঝে ঐ জঙ্গলে গিয়ে গাঁজা সেবন করত।
এ সময় মাহাবুব ইসলাম রনি সেখানে ছাব্বিরকে গাঁজা সেবন করতে দেখে এবং বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দেওয়ার কথা বলে। এতে ছাব্বির তাকে বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য বারবার অনুরোধ করে। কিন্তু রনি পুনরায় লোকজনকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে ছাব্বির আহম্মেদ ক্ষিপ্ত হয়ে রনিকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয় এবং পেছন দিক থেকে রনির গলায় হাত দিয়ে চেপে ধরে। এক পর্যায়ে ছাব্বির শিশু রনির ঘাড় মোচড় দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মরদেহে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে পালিয়ে যায়।
এই ঘটনায় গাজীপুরের স্থানীয় সম্প্রদায় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ ও পিবিআইয়ের দ্রুত তদন্ত ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম প্রশংসিত হলেও শিশু নিরাপত্তা ও মাদক বিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি উঠেছে।



