শহীদ সাবের: প্রতীকী ব্যক্তিত্ব ও রাষ্ট্র-সমাজের সংঘাতের গল্প
শহীদ সাবের: রাষ্ট্র-সমাজ সংঘাতের প্রতীক

শহীদ সাবের: রাষ্ট্র ও সমাজের বিরুদ্ধে এক প্রতীকী সংগ্রাম

এই লেখার নাম অন্য কিছুও হতে পারত, ‘রাষ্ট্রের খবর পাই, সমাজের খোঁজ কী’ দিলে অসংগত হতো না। কেননা, এ লেখা ঠিক শহীদ সাবেরকে নিয়ে নয়, রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়েই। কিন্তু এটি লিখতে গিয়ে শহীদ সাবেরকে বারবার মনে পড়ছে, একাধিক কারণে। একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তিনি একজন। তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়ও ছিল, একসময়ে থাকতাম আমরা একই পাড়াতে, যখন বয়স আমাদের অল্প ছিল। তৃতীয়ত, তাঁর কথা নতুন করে স্মরণে এসেছে আমার চট্টগ্রাম থেকে ১৯৪৭-৫২-তে প্রকাশিত পত্রিকা সীমান্তর একটি সংগ্রহ গড়তে গিয়ে। সবচেয়ে বড় কারণ অবশ্য এটা যে শহীদ সাবেরকে কেবল একজন ব্যক্তি মনে হয় না আমার, যেন তিনি প্রতীকও। প্রতীক তিনি প্রতিশ্রুতির ও অঙ্গীকারের এবং পথানুসন্ধানের।

কিশোর বয়সে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন সেই কিশোর বয়সে, পাকিস্তানি কারাগারে বিনা বিচারে আটক ছিলেন একটানা চার বছর। তখন তিনি কলেজের ছাত্র। জেল থেকে বের হয়ে এসে বিএ পাস করেন, চাকরি নিয়েছিলেন শিক্ষকতার। পরে যোগ দিয়েছেন সাংবাদিকতায়। রাষ্ট্র তাঁকে ভীষণভাবে পীড়ন করেছে, সমাজ তাঁকে রেখেছে প্রচণ্ড চাপের মুখে। মেধাবান ও সংবেদনশীল মানুষটি স্থির থাকতে পারেননি। প্রধান সত্য ছিল এটা যে তিনি একজন লেখক। সেই কিশোর বয়সে, আইএ ক্লাসের ছাত্র শহীদ সাবের গোপনে এবং নাম প্রচ্ছন্ন রেখে একটি লেখা পাঠিয়েছিলেন কলকাতার নতুন সাহিত্য পত্রিকায়, ওই পত্রিকা তখন সাহিত্যানুরাগী মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ‘আরেক দুনিয়া থেকে’ নামের লেখাটি প্রকাশের পর সাড়া পড়ে গিয়েছিল, কৌতূহল ও বিস্ময় জেগেছিল লেখকের বিষয়ে। তারপর তিনি যখনই সুযোগ পেয়েছেন লিখেছেন—গল্প, কবিতা, অনুবাদ, ছোটদের জন্য লেখাসহ নানা ধরনের কাজ আছে তাঁর। বই রেখে গেছেন। ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে মরণোত্তর একাডেমি পুরস্কার দিয়েছে, ছোটগল্পের জন্য।

সীমান্ত পত্রিকা ও বামপন্থী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট

শহীদ সাবেরের কথা নতুন করে স্মরণে এসেছে আমার চট্টগ্রাম থেকে ১৯৪৭-৫২-তে প্রকাশিত পত্রিকা সীমান্তর একটি সংগ্রহ গড়তে গিয়ে। একাডেমির জন্য সেটা একটা ভালো কাজ। কিন্তু জীবনকালে তিনি স্থির থাকতে পারেননি, ধারাবাহিকভাবে কাজ করা সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে, কেননা একেবারেই শত্রুভাবাপন্ন ছিল তাঁর পরিবেশ। তাঁর পেশা হতে পারত সাংবাদিকতা, সে পেশায় তিনি যোগও দিয়েছিলেন, কিন্তু সাংবাদিকতা তখনো আজকের মতো সংগঠিত পেশা হয়ে ওঠেনি। বেতন ছিল অল্প ও অনিয়মিত। একসময়ে আমরা কাছাকাছি বাসায় থাকতাম। দেখতাম তিনি অস্বস্তিতে আছেন। জানতাম ঘরে তাঁর সৎমা, পরিবারের তিনি প্রথম সন্তান। পিতা সরকারি চাকুরে, জেলখাটা পুত্র তার জন্য স্বস্তির কারণ ছিল না। পিতা কাজ করতেন স্বরাষ্ট্র বিভাগে, সাবের তখনো জেল থেকে বের হননি, আমরা আমাদের হাতে লেখা পত্রিকা ছেপে বের করেছিলাম। কে যেন আমাদের বলেছিল কাজটি বেআইনি, সাবেরের পিতার সঙ্গে আমাদের দেখা বাসায় গিয়ে পত্রিকা বিক্রির উপলক্ষে, তাঁকে জিজ্ঞেস করায় তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, তোমাদের এই পাবলিকেশন তো আনঅথরাইজড নিউজ লেটার বলে গণ্য হবে, এটা বেআইনি প্রকাশনা।’ আমরা অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল সরকারি কর্মচারীর স্বর শুনতে পেয়েছিলাম তাঁর কণ্ঠে, আমাদের মনে পড়েছিল যে তার জ্যেষ্ঠ সন্তান তখন কারাগারে, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে।

রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও মৃত্যুর দিকে যাত্রা

শহীদ সাবেরের ওপর স্বভাবতই চাপ ছিল সরকারি চাকরি খোঁজার। চোখে কী একটা অসুবিধা ছিল, যে জন্য সিএসএস পরীক্ষা দেননি। তবে পরীক্ষা দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় তথ্য সার্ভিসের এবং তাতে সারা পাকিস্তানে প্রথম হয়েছিলেন। কিন্তু চাকরিতে যোগ দেওয়া হয়নি, যে ছেলে ছাত্র অবস্থায় রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে জেল খেটে এসেছে তথ্য দপ্তরের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় তার জায়গা হয় কী করে। ইতিমধ্যে তাঁর পিতা সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন, সপরিবার চলে গেছেন গ্রামে। সাবের সাংবাদিকতা শুরু করেন, বাসা ঠিক করে পিতা-মাতা, ভাইবোনদের নিয়ে আসেন ঢাকায়। কিন্তু তাঁর আয় ছিল অল্প, বাসা তাই গুটিয়ে ফেলতে হয়। তারপর তাঁর থাকার আর নির্দিষ্ট কোনো জায়গা ছিল না। হতাশা নিশ্চয়ই তাঁকে ক্রমান্বয়ে গ্রাস করে ফেলছিল। তাঁকে উদ্‌ভ্রান্ত মনে হতো। একসময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। কিছুকাল রাত্রিযাপন করতেন দৈনিক সংবাদের কার্যালয়ে। ওই দৈনিক শুরু হয়েছিল মুসলিম লীগের মুখপত্র হিসেবে। কিন্তু পরে হয়ে দাঁড়িয়েছিল বামপন্থীদের সমর্থক, পাকিস্তানি হানাদারদের রোষ ছিল দৈনিকটির ওপরে। একাত্তরের ৩১ মার্চ রাতে তারা আগুন লাগিয়ে দেয় পত্রিকার কার্যালয়ে, অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান শহীদ সাবের। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র তাঁকে সহ্য করেনি, যখন তিনি কিশোর তখনই তাঁকে অবরুদ্ধ করেছিল কারাগারে, আত্মসমর্পণের আগে তাঁকে হত্যা করল। তাঁদের সাহস ছিল না যে বিচার করবে, অভ্যাস ছিল নির্বিচার প্রাণদণ্ডাদেশ দানের। শহীদ সাবেরের মৃত্যু অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি ও মেধার ক্ষয়ক্ষতি বটে।

বামপন্থী রাজনীতির সংকট ও সমাজের ভূমিকা

ওই ঘটনা একটি নয়, অনেক ঘটেছে। সেসব ঘটনার প্রতিনিধি তিনি, প্রতীকও বলা যাবে। ব্যর্থতার বোধটা ব্যক্তিগত ছিল। কিন্তু পেছনে প্রধান কারণটা ছিল সমষ্টিগত। রাষ্ট্র তাঁকে উত্ত্যক্ত করেছে, সমাজ তাঁকে আশ্রয় দেয়নি। যে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে কৈশোরেই তিনি নিজেকে যুক্ত করেছিলেন, সে রাজনীতি ধারাবাহিকভাবে সামনের দিকে এগোতে পারেনি। এই বেদনাটা সহ্য করা সহজ ছিল না। আমরা কাজী নজরুল ইসলামকে জানি। অনেক বড় প্রতিভা, স্বপ্ন দেখতেন বড় মাপের। রাষ্ট্র তাঁকেও কারারুদ্ধ করেছে, বই বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে দিয়েছে, কিন্তু খুব বড় একটা দুঃখ নিশ্চয়ই পেয়েছেন এটা দেখে যে লালিত স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য যে আন্দোলনটা ছিল, যার সঙ্গে তাঁর যোগটা ছিল মনেপ্রাণে, সেটি বেগবান হচ্ছে না, বরঞ্চ সম্পূর্ণ বিপরীত যে রাজনীতি—সাম্প্রদায়িকতার—সেটাই ক্রমাগত প্রবল হয়ে উঠেছে। সে আঘাত নিশ্চয়ই কঠিন হয়েছিল তার পক্ষে বহন করা এবং সেটাই প্রধান কারণ হবার কথা তাঁর স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য। নজরুল দেশবিভাগ দেখে যাননি, কিন্তু তার প্রস্তুতিপর্বের সাজ সাজ রবটা তো শুনছিলেন চতুর্দিকে।

সীমান্ত পত্রিকার ভূমিকা ও ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা

সীমান্ত পত্রিকার কথা বলছিলাম, এবার তার দিকে একবার তাকানো যাক। স্পষ্টতই পত্রিকাটি ছিল সমাজতান্ত্রিক চিন্তায় বিশ্বাসী। সম্পাদক নিজেকে বাম ধারার লোক বলেই মনে করতেন, কিশোর শহীদ সাবের যে ধারায় সংলগ্ন হয়েছিলেন, সমাজ-পরিবর্তনের স্বপ্ন চোখে নিয়ে। স্মরণ করা যাক, যে সীমান্ত আত্মপ্রকাশ করে ১৯৪৭ সালেই, নভেম্বর মাসে। তখনো বাংলা নাম নিয়ে পত্রিকা প্রকাশ রেওয়াজে পরিণত হয়নি, তখন ছিল আজাদ, ইত্তেহাদেরই যুগ। কিন্তু বাংলা নাম হলেই তা যে প্রগতিশীল হবে, এমনটা মনে করারও কারণ নেই। সংগ্রাম তো চমৎকার বাংলা নাম, কিন্তু জামায়াতে ইসলামির পত্রিকা। কিন্তু সীমান্ত ছিল নামে অগ্রসর, চিন্তাতেও তাই। প্রথম সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠাতেই হবীবুল্লাহ বাহারের একটি শুভেচ্ছা বক্তব্য আছে, তখন তিনি মন্ত্রী; বক্তব্যটিতে দেখছি তিনি বলছেন, ‘সীমান্তবর্তী চট্টগ্রাম সাহিত্যে আবার নতুন পথ সৃষ্টি করবে এ ভরসা আমরা করতে পারি। বাঙ্গালা সাহিত্যের কারবার এখনো মধ্যবিত্ত সমাজকে নিয়ে। জনগণকে সাহিত্যে প্রতিফলিত করা, তারই জন্য পথ রচনা করুক সীমান্ত-এর অগ্রপথিকরা।’ তিনি নিজে চট্টগ্রামেই বড় হয়েছেন, সীমান্তের অগ্রপথিকদের অনেককেই ব্যক্তিগতভাবে জানতেন, সে জন্যই বোধকরি ওইভাবে ভরসা করতে পেরেছিলেন।

শহীদ সাবেরের উত্তরাধিকার ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা

শহীদ সাবের একাত্তরে চলে গেছেন। যদি না যেতেন, যদি থাকতেন, তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে তাহলে কি তার অবস্থা ও অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসত? মনে হয় না। তাঁর চিকিৎসা? কে নিত সে দায়িত্ব? মরণোত্তর যে সাহিত্য পুরস্কার তিনি পেয়েছেন, জীবিত থাকলে তা-ইবা পেতেন কি না কে জানে। তাহলে কি তিনি হারিয়েই গেলেন? সে রকমই তো মনে হয়। একাত্তরের পরে মাহবুব-উল আলম চৌধুরী আবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন পত্রিকা প্রকাশের। এবার সাময়িকপত্র নয়, সরাসরি দৈনিক পত্রিকা, দৈনিক স্বাধীনতা নামে। কয়েক বছর বেঁচে ছিল, তারপরে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। এমনকি সীমান্ত পত্রিকার সব সংখ্যাও তো উদ্ধার করা যায়নি। ৪৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল, যাদের মাত্র ১৩টি খুঁজে পাওয়া গেছে, ওই কয়টি নিয়েই সীমান্ত সংগ্রহ। তাহলে? না, কিছুই হারিয়ে যায়নি। সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে আছে। রয়েছে সমষ্টিগত অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে, অনুভব ও চিন্তার সমন্বয় ক্ষেত্রে। ইতিহাসের চাকা যে পেছন দিকে যাবে না, এটা কোনো সান্ত্বনা বাক্যমাত্র নয়, বাস্তব সত্যও বটে। তবে যা ঘটবার কথা ছিল, তা-ই ঘটেছে। সমষ্টিগত স্বপ্নটি এখন আর আগের মতো জীবন্ত নেই। ঘটনাপরম্পরায় অস্পষ্ট হয়ে এসেছে। এর জন্য দায়ী দেশের শাসক শ্রেণি। তারা সবাই জাতীয়তাবাদী; বাঙালি জাতীয়তাবাদ দ্বিজাতিতত্ত্ব থেকে আলাদা, কিন্তু আমাদের শাসক শ্রেণির একাংশ তো বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসই করে না, অপরাংশ বিশ্বাস করে বটে কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিমূলে রয়েছে যে ধর্মনিরপেক্ষতা, সংবিধানে তার পুনর্বাসনের ব্যাপারে তাদেরও আগ্রহ নেই, এমনকি ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারে তারা যে অসম্মত, তা-ও বলা যাবে না। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যা করেছে, বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি তার চেয়ে কম কিছু করছে না। অন্য সব অপকর্ম তো রয়েছেই, সাধারণ মানুষের জন্য একটা বড় রকমের অসুবিধার কাজ তারা করেছে। সেটা হচ্ছে সামাজিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তনকে প্রতিহত করা। সমাজ আগের মতোই শ্রেণিবিভক্ত ও পশ্চাৎপদ রয়ে গেছে। আর সমাজ বদলায়নি বলেই রাষ্ট্রও বদলায়নি, তার চরিত্র রয়ে যাচ্ছে অপরিবর্তিত। বর্তমান জাতীয়তাবাদীরাও আগের জাতীয়তাবাদী শাসকদের মতোই নিজেদেরই জাতি মনে করার সুযোগ পাচ্ছে। সাতচল্লিশের পরে সীমান্তের লেখকেরা সমাজ ও রাষ্ট্রে যে ধরনের পরিবর্তন আনার কথা লিখছিলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পরেও তা আসেনি। দায়িত্বটা আসলে ছিল সমাজতন্ত্রীদেরই। জাতীয়তাবাদীরা যা করার করেছেন, তাদের ইতিবাচক কাজ একাত্তরে বিজয়ের মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে, এটা জেনে নিয়ে সমাজতন্ত্রীদের দায়িত্ব ছিল মুক্তির সংগ্রামকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তারা সেটা করতে পারেননি বলেই স্বপ্ন এখন অস্পষ্ট, শহীদদের স্মৃতিও অনুজ্জ্বল। আগামী দিনের ইতিহাস কীভাবে লেখা হবে, সেটা নির্ভর করছে সমাজতন্ত্রীদের কাজের ওপরই, অন্য সব ঘটনা গৌণ বটে, তা যতই তারা চাঞ্চল্যকর ও বিভ্রান্তিজনক হোক না কেন।