মান্দারিনের চাপে বিলুপ্তির মুখে উইঘুর ভাষা
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষাপটে পূর্ব তুর্কিস্তান বা শিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর ভাষার অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে। বিগ নিউজ নেটওয়ার্কের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় শিক্ষার্থীদের উপর মান্দারিন-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান চাপে উইঘুর ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় মাতৃভাষার অবমূল্যায়ন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের শেয়ার করা একটি ভিডিওতে অভিযোগ উঠেছে যে উইঘুর শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃভাষায় পাঠদানের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হয়েছে বা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, এটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উইঘুর ভাষাকে ধাপে ধাপে সরিয়ে দেওয়ার একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া।
ভিডিওতে একজন শিক্ষার্থী উল্লেখ করেছেন, "মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সামষ্টিক স্মৃতির ধারক। মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ হ্রাস পেলে আমাদের আত্মপরিচয় ও সামাজিক সংযোগের উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।"
আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক সংস্থা জেনোসাইড ওয়াচের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) উইঘুর জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চর্চাকে হান চীনা সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের সঙ্গে একীভূত করার নীতি অনুসরণ করছে। সংগঠনটির দাবি, স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিসিপি-নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় রূপান্তরিত করার মাধ্যমে সম্প্রদায়টির স্বাতন্ত্র্য ক্ষয়িষ্ণু করা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান অবস্থা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে:
- ১৯৯০-এর দশক থেকে 'বিগ ডেভেলপমেন্ট অব দ্য নর্থওয়েস্ট প্ল্যান'-এর আওতায় বিপুলসংখ্যক হান চীনাকে শিনজিয়াং অঞ্চলে পুনর্বাসন করা হয়েছে, যা জনমিতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন এনেছে বলে সমালোচকদের দাবি।
- ২০১৭ সাল থেকে আনুমানিক ৮ লাখ থেকে ২০ লাখ উইঘুরকে বিভিন্ন আটক বা 'পুনঃশিক্ষা' কেন্দ্রে রাখা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য রয়েছে।
- জেনোসাইড ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রে রাজনৈতিক দীক্ষা, মতাদর্শগত পুনর্গঠন, ধর্মীয় চর্চা সীমিতকরণ এবং ভাষা ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ রয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ এসব পদক্ষেপকে 'সন্ত্রাসবিরোধী' ও 'চরমপন্থা দমন' উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করলেও সমালোচক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, নীতির প্রয়োগে একটি নির্দিষ্ট জাতিগত ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠী লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
নিবিড় নজরদারি ও ভবিষ্যৎ প্রশ্ন
বর্তমানে শিনজিয়াং অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম নিবিড় নজরদারির আওতাধীন এলাকা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর নজরদারি, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং বিস্তৃত নিরাপত্তা অবকাঠামোর মাধ্যমে নাগরিকদের চলাচল ও সামাজিক আচরণ পর্যবেক্ষণের অভিযোগ রয়েছে।
ভাষা ও শিক্ষানীতি নিয়ে এই বিতর্ক আন্তর্জাতিক পরিসরে সাংস্কৃতিক অধিকার, পরিচয় ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য তাই এখানে প্রতীকী ভাষাগত বহুত্ব রক্ষার অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।
