প্রথম আলো ভবনে 'আলো' প্রদর্শনী: পুড়ে যাওয়া স্মৃতি ও গণতন্ত্রের প্রতীক
প্রথম আলো ভবনে 'আলো' প্রদর্শনী: পুড়ে যাওয়া স্মৃতি

প্রথম আলো ভবনে 'আলো' প্রদর্শনী: পুড়ে যাওয়া স্মৃতির শিল্পিক অভিব্যক্তি

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত প্রথম আলো ভবনে সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলা ও অগ্নিসংযোগের ভয়াবহতা মূর্ত হয়ে উঠেছে একটি ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনীতে। 'আলো' নামের এই প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা প্রত্যক্ষ করছেন পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই, নথিপত্রসহ ধ্বংসস্তূপ, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতির সাক্ষ্য বহন করছে।

দর্শনার্থীদের আবেগময় প্রতিক্রিয়া ও সমর্থন

প্রদর্শনীর ষষ্ঠ দিনে চিত্রশিল্পী আবদুল মান্নান বলেন, "এমন ভয়াবহতা দেখে বুকটা ভেঙে যায়, মনটা ভেঙে যায়— যারা এ ঘৃণ্য কাজ করেছে, তারা আসলে মানুষরূপী অমানুষ।" প্রকৌশলী সাহানা ফরিদ শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমানের কাজের প্রশংসা করে উল্লেখ করেন, "এটা আসলেই ভিন্ন একটি কাজ হয়েছে, ভবিষ্যতের জন্য এটি সংরক্ষণ করা উচিত।" ব্যাংকার জান্নাতুন নাঈমের মতে, "আমি ধারণাও করতেও পারিনি এমন ঘটনা ঘটবে। এরপরও প্রথম আলো পত্রিকা প্রকাশ করে দেখিয়েছে, তারা মাথা নোয়াবার নয়।"

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমর্থন ও গণতন্ত্রের বার্তা

ইউএনডিপি বাংলাদেশের রুল অব ল, জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সিনিয়র অ্যাডভাইজার রোমানা শোয়েগার প্রদর্শনী ঘুরে দেখে বলেন, "গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে। এই প্রদর্শনী একটি শক্তিশালী স্মারক। এটি গণতন্ত্রের প্রহরীদের অবিচল সাহসিকতার জোরালো প্রমাণ।" বেসরকারি দীপ্ত টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী তানভীর ফারুক ও বার্তা প্রধান এস এম আকাশও প্রদর্শনীতে উপস্থিত হয়ে সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। আকাশ বলেন, "কোনোভাবেই এ ধরনের সহিংসতা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা যদি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চাই, মানুষের উন্নয়ন চাই, তাহলে বাক্‌স্বাধীনতা থাকতেই হবে।"

প্রদর্শনীর বিস্তারিত ও সময়সূচি

শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমানের 'আলো' প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত এবং চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সর্বস্তরের দর্শকদের জন্য প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। প্রদর্শনীতে বিভিন্ন তলায় বিশেষ আয়োজন দেখা যাচ্ছে:

  • দোতলায়: আগুনে যেসব বই পোড়েনি, সেগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে, যেখানে লেখা 'এই মহাসাগরে স্নান করে জাগোরে'। নথিপত্র, বই, আসবাব, যন্ত্রাংশসহ ধ্বংসস্তূপের ওপর সাদা কফিন স্থাপন করা হয়েছে।
  • তৃতীয় তলায়: পুড়ে যাওয়া লোহালক্কড়, বৈদ্যুতিক তার এবং অন্যান্য জিনিস প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রথম আলোর কর্মীদের বক্তব্যও এখানে শোনা যাচ্ছে।
  • চতুর্থ তলায়: হামলার ভিডিও চিত্র, লুটপাট ও ভাঙচুরের দৃশ্য প্রদর্শিত হচ্ছে। ভাঙচুর করা জিনিসপত্রের ওপর একঝাঁক কবুতরের শিল্পকর্ম স্থাপন করা হয়েছে।

সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান ও সৈয়দা জাহানারা দম্পতি মিরপুর থেকে সন্তানদের নিয়ে প্রদর্শনী দেখতে এসেছেন। সৈয়দা জাহানারা, যিনি ২০১৬ সাল থেকে নিয়মিত প্রথম আলো পড়েন, বলেন, "হামলার এক দিন পর প্রথম আলো হাতে পেয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম।" প্রদর্শনীটি শুধু শিল্পকর্ম নয়, বরং একটি সমাজিক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা গণতন্ত্র ও বাক্‌স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।