জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নামফলক থেকে 'মুক্তিযুদ্ধ' শব্দ মুছে ফেলা
জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলায় মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য নির্মিত একটি জাদুঘরের নামফলক থেকে 'মুক্তিযুদ্ধ' শব্দটি কৌশলে মুছে ফেলা হয়েছে। এই ঘটনায় স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
জাদুঘরের বর্তমান অবস্থা
সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, পাঁচবিবি পৌরসভা ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত 'পাঁচবিবি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংরক্ষণশালা'র মূল ফলক থেকে 'মুক্তিযুদ্ধ' শব্দটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে শুধুমাত্র 'পাঁচবিবি জাদুঘর সংরক্ষণশালা' লেখা রয়েছে।
জাদুঘর কক্ষের ভেতরের দৃশ্য আরও করুন। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের ওপর ধুলোর পুরু আস্তরণ জমে আছে। কক্ষটির এক কোণে পৌরসভার অব্যবহৃত জিনিসপত্র স্তূপ করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে এই কক্ষটি ময়লা রাখার ভাগাড় বা ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
জাদুঘরের ইতিহাস ও গুরুত্ব
২০২২ সালের ১৮ এপ্রিল তৎকালীন শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খানের হাত দিয়ে এই জাদুঘরটির উদ্বোধন করা হয়েছিল। জাদুঘরটি শুরু থেকেই বেশ সমাদৃত হয়েছিল কারণ এতে সংরক্ষিত ছিল:
- বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা
- মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম
- গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন
- দুর্লভ বই ও দলিলের সংগ্রহ
অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় শিক্ষার্থী, গবেষক ও ইতিহাস অনুরাগীদের কাছে জাদুঘরটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমানে এর করুণ অবস্থা সকলকে ব্যথিত করেছে।
মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পাঁচবিবি উপজেলার আয়মারাসুলপুর ইউনিয়নের আগইর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জাল হোসেন বলেন, "স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির ইন্ধন ছাড়া এমন দুঃসাহস দেখানো সম্ভব নয়।"
স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তা আক্তারসহ অন্যান্যরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। মালিদহ গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক মণ্ডলের ছেলে মনিরুজ্জামান মনির বলেন, "মুক্তিযুদ্ধকে ব্যঙ্গ করার চক্রান্তেরই অংশ এটি। যারা আমাদের গৌরবের ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।"
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের বক্তব্য
পাঁচবিবি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুর রউফ বুলু এই ঘটনাকে 'অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও ঘৃণিত কাজ' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, "কে সরালো, কে নাম কাটল, কার ইন্ধনে হলো—তা জানতে চাই।"
জয়পুরহাট জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জহুরুল আলম তরফদার রুকু বলেন, "মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নামফলক থেকে শব্দ মুছে ফেলা নিন্দনীয় অপরাধ। যারা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে চায় তারাই এ কাজ করেছে।"
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিশ্রুতি
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে পাঁচবিবি পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ও নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) জোবাইদুল হক বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধ' শব্দটি মুছে ফেলা এবং সেখানে ডাস্টবিন রাখা অত্যন্ত অনুচিত হয়েছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নামফলকটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে।
পাঁচবিবি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিম হোসেন জানান, জাদুঘরটি দীর্ঘদিন সঠিক ব্যবস্থাপনায় ছিল না। তিনি বলেন, "জাদুঘরটি সংস্কার করে নতুনভাবে ও সুন্দর পরিবেশে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।"
এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও জাতীয় গৌরব রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। স্থানীয়রা আশা করছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাদুঘরটির মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষিত হবে।
