বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থার বিস্তার: অনলাইন-অফলাইন উভয় ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি
বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থার বিস্তার: অনলাইন-অফলাইন উদ্বেগ

বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থার বিস্তার: অনলাইন-অফলাইন উভয় ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি

দেশে ধর্মীয় চরমপন্থার চর্চা ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে, যেখানে অনলাইন ও অফলাইন উভয় স্পেসেই এর দৃশ্যমানতা লক্ষণীয়। চরমপন্থী চিন্তার প্রবাহ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, কারণ এর তৎপরতা, সংযুক্তি, তর্ক-বিতর্ক এবং অনুসারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। কানাডাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেকডেভের ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত 'শ্যাডোজ ওভার দ্য ব্যালট' সহ অন্যান্য প্রতিবেদনে বাংলাদেশে চরমপন্থা চর্চার গতিপ্রকৃতি ও আধিক্যের সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই বিশ্লেষণটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাগে বিভক্ত করে উপস্থাপন করা হলো।

অনলাইন-অফলাইন স্পেস: চরমপন্থী গোষ্ঠীর সরব উপস্থিতি

সেকডেভের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সহিংস চরমপন্থী গোষ্ঠী জন-অসন্তোষ, উৎকণ্ঠা, নারী ইস্যু, ভারতবিরোধিতা, আওয়ামী লীগের অপশাসন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের ভূমিকার প্রশ্ন তুলে ধরে নতুন ন্যারেটিভ নির্মাণের চেষ্টা করছে। এরিও ডব্লিউ ক্রগোল্যাংকির গ্রন্থ 'দ্য থ্রি পিলার অব র্যাডিক্যালাইজেশন: নিডস, ন্যারেটিভ অ্যান্ড নেটওয়ার্ক'-এ চরমপন্থা চর্চায় থ্রি এন-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চরমপন্থীরা প্রথমে সমাজে এর প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেন, এরপর বয়ান নির্মাণ করেন এবং সেই বয়ান বিস্তারের জন্য নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

এ কথা সত্য, বাংলাদেশে চরমপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীর এ তৎপরতা দিন দিন ভিন্ন মাত্রা পাচ্ছে। মানুষের ভেতরে থাকা নানা রকম অভাব ও নির্ভরতা—যেমন কাজের সুযোগ, নিরাপত্তা, প্রতিশোধপরায়ণতা, বৈষয়িক বা আধ্যাত্মিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা—এ ধরনের নেটওয়ার্ক বা সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত হতে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করছে। ডেভিড জ্যাকম্যান তাঁর 'সিন্ডিকেটস অ্যান্ড সোসাইটিজ: ক্রিমিনাল পলিটিকস ইন ঢাকা' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এসব সিন্ডিকেট সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং কঠোরভাবে পরিচালিত হয়। নেটওয়ার্কের কর্ণধারেরা অনুসারীদের মানসিক উৎপাদনও নিয়ন্ত্রণ করেন, যাতে একধরনের আবেগগত উত্তেজনা অব্যাহত থাকে।

নিয়ন্ত্রণহীন তৎপরতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা

নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এ ধরনের তৎপরতা চলতে থাকলে তা ধীরে ধীরে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে। অনলাইনে জবাবদিহির ঘাটতি শেষ পর্যন্ত অফলাইন পরিসরেও একই ধরনের সুযোগ তৈরি করে। ফিলিপাইনের নোবেলজয়ী সাংবাদিক মারিয়া রেসা তাঁর 'হাউ টু স্ট্যান্ড আপ টু এ ডিকটেটর' গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, অনলাইন ইমপিউনিটি খুব স্বাভাবিকভাবেই অফলাইন ইমপিউনিটিতে রূপ নেয়, যা বিদ্যমান চেক অ্যান্ড ব্যালান্স ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সেকডেভের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চরমপন্থী তৎপরতার বিষয়ে নির্লিপ্ত। এমন অভিযোগও রয়েছে, ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অনেক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং অনেকে মুক্তি পেয়েছেন।

ধর্মীয় উগ্রবাদের গতিশীল প্রবণতা

ধর্মীয় উগ্রবাদের চর্চা কোনো স্থবির প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি গতিশীল প্রবণতা। গত এক দশকে এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এ চর্চাকে আরও প্রবহমান করেছে। গ্লোবাল যোগাযোগব্যবস্থায় পারস্পরিক সংযোগ বৃদ্ধিও এতে ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্য, ফিলিস্তিন, কাশ্মীরসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানদের নিপীড়নের অভিজ্ঞতা চরমপন্থী অভিব্যক্তির পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। ফলে ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সরেজমিন বক্তব্যের মাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি জানাচ্ছে এবং জনমনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

চরমপন্থী গোষ্ঠীর প্রচারণায় অপতথ্যের ব্যবহার

সেকডেভের প্রতিবেদনে চরমপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রচারণা কৌশল হিসেবে অপতথ্যের ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তাদের লক্ষ্যবস্তু প্রধানত তরুণ সমাজ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৭ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে। ফলে দেড় কোটি তরুণ ভোটারের মধ্যে ভোটের প্রতি অনাস্থা তৈরি করা গেলে কাঙ্ক্ষিত পথ সহজ হবে—এমন ধারণা থেকে চরমপন্থী গোষ্ঠী দলীয় রাজনীতির বদলে ডিজিটাল মাধ্যমকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ডেটা রিপোর্টাল-এর 'ডিজিটাল ২০২৬: বাংলাদেশ' প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে সেকডেভ জানিয়েছে, দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী ৬ কোটি ৪০ লাখ, টিকটক ৫ কোটি ৬২ লাখ এবং ইউটিউব ব্যবহারকারী প্রায় ৪ কোটি ৯৮ লাখ। এই 'ঘন ডিজিটাল নেটওয়ার্ক' অপতথ্য বিস্তারের জন্য বড় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

তাকফিরিবাদ: চরমপন্থী গোষ্ঠীর অভিন্ন গন্তব্য

সেকডেভের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরমপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠী তাকফিরিবাদে বিশ্বাসী। এটি এমন এক মতবাদ, যেখানে ভিন্নমতাবলম্বী মুসলমানদের ধর্মচ্যুত ঘোষণা করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ন্যায্য বলে বিবেচিত হয়। এতে 'ভেতরের শত্রু' ধারণা তৈরি হয়। কঠোর আক্ষরিক ব্যাখ্যা থেকে সামান্য বিচ্যুতিও এখানে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিবেদনের মতে, দেশে সক্রিয় এসব গোষ্ঠীর মতাদর্শ তেহরিক-ই-তালিবান বা আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট ধারার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। এ তথ্য সত্য হলে তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের কারণ।

চরমপন্থী তৎপরতা মোকাবিলার পথ

ধর্মীয় চরমপন্থী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির সুসংহত অঙ্গীকার অপরিহার্য। এটি কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হলে সমাজে এ প্রবণতা কমতে পারে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, বৈষম্য ও অন্যায্যতা চরমপন্থার পথ প্রশস্ত করে—এ সত্য অস্বীকারের সুযোগ নেই। গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিস্তৃত সংলাপ, সমঝোতা ও সহযোগিতা প্রয়োজন। ভিন্নমত ও আদর্শের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সমালোচনামূলক তথ্য ও বিশ্লেষণ সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে। উন্নত বিকল্প দিয়ে অনুন্নত বিকল্পকে প্রতিহত করতে হবে—ধৈর্য ও অহিংস উপায়ে। মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশই ধর্মীয় চরমপন্থা মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।