পাকিস্তানের পাঞ্জাবে পুলিশের 'এনকাউন্টারে' ৮ মাসে ৯২৪ জন নিহত: মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট
পাকিস্তানের পাঞ্জাবে পুলিশের এনকাউন্টারে ৯২৪ জন নিহত

পাকিস্তানের পাঞ্জাবে পুলিশের 'এনকাউন্টারে' ৮ মাসে ৯২৪ জন নিহত

পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে বিগত আট মাসে দেশটির পুলিশ অন্তত ৯২৪ জনকে হত্যা করেছে বলে একটি মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে। এসব হত্যাকাণ্ড গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চালানো হয়েছে। পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস কমিশন অফ পাকিস্তান (এইচআরসিপি) এই বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছে। খবরটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে।

ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্টের ভূমিকা

রিপোর্টে বলা হয়েছে, বড় ও সংগঠিত অপরাধ দমনের জন্য ২০২৫ সালের এপ্রিলে পাঞ্জাবে গঠন করা হয় ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট (সিসিডি)। এরপর থেকেই এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে শুরু করে। সিসিডি গঠন করার পর অন্তত ৬৭০টি 'এনকাউন্টার'-এ ৯২৪ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন। এইচআরসিপি তাদের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলেছে, পাঞ্জাবের সিসিডি আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন করে পরিকল্পিতভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে।

জুবাইদা বিবির পরিবারের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা

গত বছরের নভেম্বরে এমন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে দক্ষিণ পাঞ্জাবের বাহাওয়ালপুর শহরে জুবাইদা বিবির পরিবার। তিনি জানান, যখন সিসিডি'র সশস্ত্র কর্মকর্তারা তাদের বাড়িতে হানা দেয় তখন তারা বাড়ি থেকে সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়। মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ, জুয়েলারি এবং মেয়ের যৌতুকের টাকাও কর্মকর্তারা নিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন জুবাইদা। তিনি বলেন, "এসব লুটপাটের পাশাপাশি আমার ছেলেদেরও নিয়ে যায় তারা।"

আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তুলে নিয়ে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জুবাইদা বিবির পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হত্যা করা হয়। পাঞ্জাবের বিভিন্ন জেলায় তাদের পুলিশ এনকাউন্টারে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন জুবাইদার তিন ছেলে—ইমরান (২৫), ইরফান (২৩), আদনান (১৮)—এবং দুই জামাতা। এইচআরসিপি'কে জুবাইদা বলেছেন, "তারা বাহাওয়ালপুরে আমাদের বাড়ি ভেঙে প্রবেশ করে এবং সবকিছু নিয়ে যায়। আমরা লাহোর পর্যন্ত তাদের অনুসরণ করি এবং সন্তানদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করি। কিন্তু পরেরদিন সকালেই পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাই।"

পুলিশের হুমকি ও পরিবারের প্রতিক্রিয়া

পরবর্তী সময়ে জুবাইদা আদালতে মামলা করলে পুলিশ হুমকি দেয় যে মামলা না তুললে পরিবারের বাকি সদস্যদেরও হত্যা করা হবে। জুবাইদার স্বামী আবদুল জব্বার জোর দিয়ে বলেন, "আমার ছেলেদের কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না। তারা সবাই বিবাহিত, সন্তানের বাবা এবং কাজকর্ম করতেন।" এই ঘটনা পাঞ্জাবের পুলিশি বর্বরতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিক্রিয়া

আল জাজিরা জানিয়েছে, পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফের অধীনে সিসিডি গঠন করা হয়েছে। মরিয়ম তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মেয়ে এবং বর্তমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের ভাইঝি। এই রিপোর্ট প্রকাশের পর পাকিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এইচআরসিপি'র প্রতিবেদনটি পাঞ্জাব প্রদেশে পুলিশি নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, যা দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।