নতুন সরকারের সামনে তিনটি গণমাধ্যম ইস্যু: হত্যা মামলা, অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল ও মুক্ত সংবাদ
নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জন্য অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মোকাবিলার প্রশ্ন সামনে এসেছে। এই ইস্যুগুলো হলো—অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাংবাদিকদের হত্যা মামলায় আসামি করার অভিযোগ, মুক্ত গণমাধ্যম নিশ্চিত করা এবং পেশাদার সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের বিতর্ক। গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ক্ষেত্রে—এই তিন ইস্যুতে মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার চাপ
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৮৮টি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব মামলার একটি অংশ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্য একটি মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ২৬৬ জন সাংবাদিককে হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় আসামি করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পরবর্তী সময়ে সাংবাদিক নিপীড়নের ৫২৩টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৪০ জন সাংবাদিক ফৌজদারি বা হত্যা মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। এ ছাড়া সাংবাদিকদের ওপর হামলা, কর্মস্থল বা রাস্তায় হেনস্তা, প্রেস কার্ড কেড়ে নেওয়া এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো অভিযোগও ব্যাপকভাবে উত্থাপিত হয়েছে।
মুক্ত গণমাধ্যম: নীতি ও বাস্তবতার ফারাক
সংবিধানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলেও বাস্তবে বিভিন্ন আইন, প্রশাসনিক চাপ এবং বিজ্ঞাপননির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে অনেক গণমাধ্যম আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘সেলফ সেন্সরশিপে’ বাধ্য হয়, এমন অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পেশাদার সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের ঘটনায় আস্থার সংকট তৈরি হয়। সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দফতরে প্রবেশ ও তথ্য সংগ্রহের জন্য এই কার্ড গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এই বিতর্কটি এখনও চলমান এবং নতুন সরকারের পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে।
এখন কী করবে তথ্য মন্ত্রণালয়?
নতুন সরকারের অধীনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এই তিন ক্ষেত্রে কী ধরনের নীতি ও বাস্তব পদক্ষেপ নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল এবং প্রশাসনিক চাপের অভিযোগ মিলিয়ে অনাস্থার পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়াতে পারে। গণমাধ্যমের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নতুন ভিত্তি পেতে পারে—যদি স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। তবে এসব বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কেউ এখনই কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা কমিশন থেকে যে সুপারিশমালা দিয়েছিলাম—বর্তমান সরকার যেন সেগুলো বিবেচনা করে, বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, বাস্তবায়ন করে। কমিশন থেকে দেওয়া সংস্কারের প্রস্তাব পূর্ণাঙ্গ ছিল—গণমাধ্যমকে সংকটমুক্ত করা, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে সংবাদ মাধ্যমের যে স্বচ্ছতা জবাবদিহির প্রশ্ন, সেটাও নিশ্চিত করা। এগুলো সব দিক বিবেচনায় নিয়েই একটা পূর্ণাঙ্গ সুপারিশমালা আমরা দিয়েছিলাম, সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। অন্তর্বর্তী সরকার করতে পারেনি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা বিশ্বাস করি এই সরকার সেটা করতে পারে। সেই সদিচ্ছা তাদের থাকলে তারা যেন সেটা করে। এটা আমরা প্রত্যাশা করি। বিশেষ করে বিএনপি তার নির্বাচনি অঙ্গীকার যেটা ৩০ দফা, সেখানে বলেছিল—তারা একটা স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন করবে এবং সংবাদ মাধ্যমে স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। সে কারণে আমরা দাবি করি, তারা যেন এটা করে।’’ এই মন্তব্যগুলো নতুন সরকারের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে থাকা সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীদের আশা জাগিয়েছে।
