বগুড়ায় চাঁদা না দেওয়ায় ঝাড়ুদার হত্যা, লাশ নিয়ে বিক্ষোভে প্রশাসনিক অফিস ঘেরাও
বগুড়া পৌরসভার একজন তরুণ ঝাড়ুদার সুনীল বাঁশফোড়কে (২৩) প্রকাশ্য দিবালোকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় হরিজন সম্প্রদায়ের লোকজন তীব্র বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে দায়ী মাদককারবারিকে গ্রেফতারের দাবিতে বুধবার দুপুরে তারা নিহতের মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করে শহরের সাতমাথায় অবস্থান নিয়েছেন। পরবর্তীতে বিক্ষোভকারীরা পুলিশ সুপার (এসপি) ও জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় ঘেরাও করে ফেলেন। এ সময় তারা প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেফতারের কঠোর আলটিমেটাম দিয়েছেন, নতুবা সারা দেশে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন।
বিক্ষোভের বিস্তারিত বিবরণ
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের সেউজগাড়ি সুইপার কলোনি থেকে হরিজন সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ সুনীল বাঁশফোড়ের মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথায় পৌঁছালে সেখানে মরদেহ রেখে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন, যার ফলে শহরের প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তারা মরদেহ নিয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে জমায়েত হন এবং ‘খুনি অনিকের ফাঁসি চাই’ সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কার্যালয় ঘেরাও রাখার পর তারা পাশেই অবস্থিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চলে যান এবং সেখানেও একই দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন।
হত্যাকাণ্ডের পটভূমি ও বিক্ষোভকারীদের দাবি
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১২ ফেব্রুয়ারি, যখন সুনীল বাঁশফোড় স্থানীয় একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়ে শহরের স্টেশন রোডে বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদের সামনে আসেন। সেখানে অনিক নামে এক মাদককারবারি তার কাছ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা দাবি করেন। সুনীল চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অনিক একটি চাকু দিয়ে তার পেট ও উরুতে বারবার ছুরিকাঘাত করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। গুরুতর আহত সুনীলকে প্রথমে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাত ৯টার দিকে তিনি মারা যান। তার বাবা সদর থানায় হত্যার মামলা দায়ের করেছেন।
হরিজন সম্প্রদায়ের বগুড়া জেলা সভাপতি দিপক রাম এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রকাশ্য দিবালোকে মাত্র ৫০০ টাকা চাঁদা না পেয়ে আমাদের ছেলে সুনীলকে হত্যা করা হয়েছে। অথচ পুলিশ এখনও মূল আসামি অনিককে গ্রেফতার করতে পারেনি।” তিনি সতর্ক করে দিয়ে যোগ করেন, “প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আসামি ধরা না পড়লে কাল থেকে সারা দেশের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কাজ বন্ধ করে দেবেন।”
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপ
বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তফা মঞ্জুর বিক্ষোভকারী হরিজন সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে জানান, আসামি গ্রেফতারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।” তবে বিক্ষোভকারীরা প্রশাসনের এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট না হয়ে তাদের দাবি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যত কর্মসূচির হুমকি দিচ্ছেন।
এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি স্থানীয় হত্যাকাণ্ডই নয়, বরং এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরিজন সম্প্রদায়ের এই বিক্ষোভ পুরো দেশের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একত্রিত হওয়ার একটি সংকেত দিচ্ছে, যা প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে।
