জুলাই যোদ্ধাদের প্রত্যাশা: নতুন সরকারের কাছে সুচিকিৎসা ও সম্মান চান ইমরান ও মিজানুর
জুলাই যোদ্ধাদের প্রত্যাশা: নতুন সরকারের কাছে সুচিকিৎসা চান

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত দুই যোদ্ধার নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা

রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ পাশে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ সড়কে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল বড় পর্দায় নতুন মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠান দেখছিলেন ইমরান হোসেন ও মিজানুর রহমান। তাঁরা দুজনই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে একটি করে চোখ হারিয়েছেন, যা তাদের জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে।

আহত দুই শিক্ষার্থীর বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা

ইমরান হোসেন ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে পুলিশের গুলিতে বাঁ চোখ হারান। তাঁর পুরো শরীরে বিভিন্ন জায়গায় এখনো ছররা গুলির স্প্লিন্টার রয়ে গেছে, যা তীব্র যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মিজানুর রহমান ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানার সামনে পুলিশের গুলিতে বাঁ চোখ হারান, তাঁর চোখ আস্তে আস্তে সাদা হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।

আজ মঙ্গলবার বিকেলে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা হয় এই দুই জুলাই যোদ্ধার। নতুন সরকারের কাছে তাঁদের প্রত্যাশার কথা জানান তাঁরা। দুজনেই শিক্ষার্থী ছিলেন, কিন্তু আন্দোলনের পর থেকে আর পড়াশোনা করতে পারছেন না, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

ইমরান হোসেনের আবেগঘন আবেদন

ইমরান হোসেন বলেন, ‘আমাদের যারা আহত জুলাই যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবার আছে, আমরা চাই নতুন সরকার যাতে আমাদের কথা মাথায় রাখে, মনে রাখে, যেন ভুলে না যায়। কারণ, আমাদের এই ত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই সরকারের শপথের পথ তৈরি হলো। আমরা যদি মাঠে না নামতাম, আমাদের শহীদেরা যদি জীবন উৎসর্গ না করত, তাহলে এখনো ক্ষমতায় কিন্তু সেই ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ থাকত। সুতরাং আমরা এবং আমাদের শহীদদের আত্মত্যাগকে যাতে এই নতুন সরকার মনে রাখে, সেটি আমাদের প্রথম চাওয়া।’

সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না অভিযোগ করে ইমরান হোসেন আরও বলেন, ‘অন্তরবর্তী সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল—উনি দেশটাকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করবেন, শহীদ পরিবারের পাশে থাকবেন, আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু আমরা যথাযথ চিকিৎসা পাইনি। এখনো পাচ্ছি না। আমার হাতে, শরীরে এখন অনেকগুলো ছররা গুলির স্প্লিন্টার ঢুকে আছে। এগুলো বের করতে হবে। আমার চোখে গুলি লাগছে দুই বছরের কাছাকাছি, ডাক্তার বলেছে আমার একটা চোখ পচে যাচ্ছে, ওইটা নাকি উঠায় ফেলতে হবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের চাওয়া, তিনি যাতে আমাদের যথাযথ, ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। শহীদ পরিবার এবং আহত যাঁরা আছেন, তাঁদের যেন অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসা এবং আর্থিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন হয়।’

ইমরান হোসেনের ইচ্ছে ছিল জুলাই যোদ্ধা হিসেবে সংসদ ভবনে ঢুকে সরাসরি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান দেখবেন। কিন্তু পাস না থাকায় বাধার মুখে ঢুকতে পারেননি, যা তার হতাশা বাড়িয়েছে।

মিজানুর রহমানের আশা ও বাস্তবতা

চোখ হারানো আরেক জুলাই যোদ্ধা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা স্বৈরাচার সরকারকে বিতাড়িত করেছি। এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই সরকার আসছে। এখন একটাই প্রত্যাশা, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, সাধারণ মানুষ আমরা যেন সুস্থভাবে, সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারি।’

নিজের হারানো চোখের কথা উল্লেখ করে মিজানুর রহমান আরও বলেন, ‘আমার চোখটা আস্তে আস্তে সাদা হয়ে গেছে, ড. ইউনুসের সরকার যদি দ্রুত একটা ব্যবস্থা নিত, তাহলে আমাদের আহতদের এত কষ্ট হতো না। অনেক ভাই আছে, যাদের হাত-পা পচে যাচ্ছে। আমরা চাই নতুন সরকার আমাদের এই সমস্যাগুলোর বিষয়ে একটু দেখুক। আমরা যাতে অন্তত চিকিৎসাটা পাই।’

এই দুই যোদ্ধার কণ্ঠে শোনা যায় বেদনা ও প্রত্যাশার মিশ্রণ, যা নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।