অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাস: একটি পর্যালোচনা
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার প্রধান হিসেবে শপথ নেন। শপথের দিন দুপুরে তিনি ফ্রান্স থেকে ঢাকায় পৌঁছে বলেন, "আমাদের কাজ হলো সবাইকে রক্ষা করা। প্রতিটি মানুষকে রক্ষা করা, প্রতিটি মানুষ আমাদের ভাই। একটা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে নিয়ে আসা।" তিনি দেশবাসীর কাছে আবেদন জানান, তার ওপর আস্থা রেখে সহিংসতা বন্ধ করতে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও পুনরুদ্ধার
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে অবনতি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে, যা পুনরায় কাজে ফিরতে প্রায় ৪ মাস সময় নেয়। ঢাকাসহ সারা দেশে রাতের বেলা ডাকাতির আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে এলাকাবাসী নিজ উদ্যোগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক মাস লেগে যায়, এবং এক পর্যায়ে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামতে হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হন, যা ২০২৪ সালের ১২৮ জনের চেয়ে বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মোট ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসে প্রাণ হারান। ২০২৫ সালে কারাগারে কমপক্ষে ১০৭ জনের মৃত্যু ঘটে, যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৫। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও হামলা
অন্তর্বর্তী সরকার গণমাধ্যম স্বাধীনতার দাবি করলেও, মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভিন্ন মত পোষণ করে। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে সংঘটিত হয় জঘন্য হামলা, যেখানে ভাঙচুর, লুটতরাজ ও আগুন-সন্ত্রাস চালানো হয়। আসকের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে কমপক্ষে ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন, যা গণমাধ্যমের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও বিনিয়োগ সংকট
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনীতি যথেষ্ট স্থবির ছিল বলে অর্থনীতিবিদরা মত দেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট, বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ ও পাচারের অর্থ ফেরত না আসা প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যায়। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি, এবং ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট বিদ্যমান ছিল।
বিনিয়োগ ক্ষেত্রে স্থবিরতা দেখা দেয়, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস পায়। বাংলাদেশ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আনায় প্রতিযোগী দেশগুলোর থেকে পিছিয়ে পড়ে, এবং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ মানুষ কাজ হারান।
সংস্কার কার্যক্রম ও জুলাই জাতীয় সনদ
অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কাজের লক্ষ্যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে, যাদের সুপারিশের ভিত্তিতে কিছু সংস্কার বাস্তবায়িত হয়। উল্লেখযোগ্য সংস্কারের মধ্যে রয়েছে:
- বিচার বিভাগে সংস্কার
- সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন
- সরকারি চাকরিতে নিয়োগের বয়সসীমা বৃদ্ধি
- ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন
- গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগদান
২০২৫ সালের জুলাই মাসে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতার অভাব দেখা দেয়।
বিদেশি চুক্তি ও শেষ মুহূর্তের প্রকল্প
অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা করে, যদিও শেষ মুহূর্তে তা পিছিয়ে যায়। ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস ও সুইজারল্যান্ডের মেডলগের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক ও জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলমান থাকে।
সরকারের শেষ দিনগুলোতে, ৬৪টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়, যার মোট ব্যয় ১ লাখ ৬ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ ক্রয় ও চীন থেকে জাহাজ কেনার চুক্তি উল্লেখযোগ্য।
দুর্নীতি সূচকে অবনমন
২০২৫ সালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম, যা ২০২৪ সালের ১৪তম থেকে এক ধাপ অবনমন নির্দেশ করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের মতে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করেছে।
সামগ্রিকভাবে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাস আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও মানবাধিকার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, পাশাপাশি সংস্কার ও বিদেশি সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি সাধন করে।
