দেশজুড়ে বেড়েই চলেছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
দেশজুড়ে বেড়েই চলেছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, উদ্বেগজনক

দেশজুড়ে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেই যাচ্ছে, যা জনমনে নতুন করে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তার এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধ—বিভিন্ন কারণেই ঘটছে এসব হত্যাকাণ্ড। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহিংসতার ধরন বদলাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মানুষই পরিণত হচ্ছেন হত্যার শিকার বা অভিযুক্তে, যা সামাজিক অবক্ষয়ের গভীর সংকেত দিচ্ছে।

সম্প্রতি আলোচিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ড

শনিবার (৯ মে) গাজীপুরে নারী ও তিন শিশুসহ একই পরিবারের পাঁচজনকে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একইভাবে ময়মনসিংহে অপহরণের পর শিশুহত্যা, নরসিংদীতে শিশু নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা, চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে গুলি এবং বিভিন্ন জেলায় পারিবারিক সহিংসতাজনিত হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, শুধু এপ্রিল মাসেই রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ছয়জন। মব সহিংসতায় নিহত ২২ জন এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ২৯৪ জন নারী ও শিশু। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন এবং মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৯ জন। একই সময়ে অন্তত ৯ নারী ও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিন মাসে শুধু রাজধানীতেই ৫৭টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৭৫০ থেকে ৭৭০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫০টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কিশোর গ্যাং সংঘর্ষ, জমিজমা বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ৮৪০ জন নিহত হয়। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে গেছে। এসব ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

গত কয়েকদিনের আলোচিত কিছু হত্যাকাণ্ড

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আন্দালিব সাদমান রাফি (৯) নামের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে শিশুটির বাবার সঙ্গে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। শনিবার (৯ মে) দুপুরে অভিযুক্ত নূর মুহাম্মদ খোকনের বাড়ির স্যানেটারি ল্যাট্রিনের রিং স্ল্যাবের ভেতর থেকে বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে শারমিন আক্তার (৩০), তার তিন সন্তান- মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) এবং রসুল মিয়া (২২) নামের এই পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জেরে শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত। ঘটনাটি তদন্তে সিআইডি ও পিবিআইসহ বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে। খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে কোদালের আঘাতে মাহিনুর আক্তার (২৪) নামে এক গৃহবধূকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার স্বামীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামে এক যুবককে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় ১১ বছর বয়সী এক শিশু, যার মাথায় গুলি বিদ্ধ হয়। শিশুটি এখন হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তালাবদ্ধ ঘর থেকে বর্ষা আক্তার (২০) নামে এক গার্মেন্টস কর্মীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে তার স্বামী পলাতক রয়েছেন।

কেন বাড়ছে সহিংসতা

এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত বিচার না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমে যাচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তিনি অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সহিংসতার বড় অংশ পারিবারিক ও সামাজিক সংঘাত থেকে সৃষ্টি হচ্ছে। পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অর্থনৈতিক বিরোধ, সম্পর্কজনিত দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক সহনশীলতার ঘাটতি সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে।

তার মতে, উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি ভুক্তভোগীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বা পরিচিতজন। এটি সামাজিক সম্পর্কের কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। দ্রুত বিচার ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হলে সহিংসতা কমানো কঠিন হবে।

পুলিশের বক্তব্য

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই দুঃখজনক। পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা আগে থেকে প্রতিরোধ করা অনেক সময় কঠিন হলেও পুলিশ প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে এবং অপরাধীদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে কাজ করছে।’

দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছেন, বর্তমানে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার অত্যন্ত কঠোর ও আইনানুগ অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সেই বিষয়েও পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।’