টিআইবির নির্বাহী পরিচালক: গণমাধ্যম ১৭ বছর কর্তৃত্ববাদী শাসনে ছিল
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক: গণমাধ্যম ১৭ বছর কর্তৃত্ববাদী শাসনে ছিল

বাংলাদেশের গণমাধ্যম গত ১৭ বছর কর্তৃত্ববাদী শাসনের মধ্যে ছিল বলে দাবি করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দেশের দুটি শীর্ষ গণমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

সম্মেলনে টিআইবি নির্বাহী পরিচালকের বক্তব্য

শুক্রবার (৮ মে) রাজধানীর রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে 'বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬'–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক এই দাবি ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দু'দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই কনফারেন্সের আয়োজক মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই)। এতে সারা দেশের সাড়ে চারশর বেশি সাংবাদিক, সাংবাদিকতার শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'বাংলাদেশ গত ১৭ বছর, বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসনের মধ্যে ছিল। সেই সময়ে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।' তিনি আরও বলেন, 'বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতা ঝুঁকির সম্মুখীন। গত এক দশকে সারা বিশ্বে কমপক্ষে ৫০০ সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইফতেখারুজ্জামানের আশা, প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমন সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্মেলনের উন্মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর দিকনির্দেশনা বেরিয়ে আসবে।

এমআরডিআই'র নির্বাহী পরিচালকের বক্তব্য

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমআরডিআই'র নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুর বলেন, 'আমরা আসলে সবাইকে নিয়েই কনফারেন্সটা করতে চেয়েছি। আমরা একা থাকতে চাইনি। আমরা চেয়েছি সবাই আমাদের সঙ্গে থাকুক, অংশীজন হোক এবং সেই কারণেই আমরা এই কনফারেন্সের নাম দিয়েছি 'বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স'।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আমরা যখন ৬০ জনকে ফেলোশিপ দেওয়ার ঘোষণা দেই, তখন মোটামুটি ১৮৮টি ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আইডিয়া আমরা পাই। এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করার মন-মানসিকতা ও সাহস সাংবাদিকদের আছে এবং তারা এটি করতে চায়। তাহলে আমাদের খুঁজে দেখা দরকার—এই সংখ্যাটি যেহেতু এত বড়, কেন আমরা পত্রিকা বা টেলিভিশনে এত বিপুল সংখ্যক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দেখতে পাই না।'

সরকার পতনের কারণ ও স্বাধীন গণমাধ্যম

সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে না দেওয়া—এমন মন্তব্য করেছেন দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেছেন, 'বিগত সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ ছিল স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে না দেওয়া।'

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মধ্যেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত জানিয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, 'তবে দেশে অতীতে যথেষ্ট পরিমাণে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হয়নি। বর্তমানেও হচ্ছে না। আর ভবিষ্যতেও হবে কি না, তা নির্ভর করছে সম্পাদকদের ভূমিকার ওপর।' তিনি আরও বলেন, 'রাইজ অব এডিটোরিয়াল ইনস্টিটিউশন এবং ইনডিপেনডেন্ট জার্নালিজমই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সম্পাদকেরা সেই মানে পৌঁছাতে পারছেন না।'

সাংবাদিকতাকে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, 'আমরা যারা সাংবাদিকতা করি, আমরা পেশাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি না বলে আমার ধারণা। আমরা খুব সহজেই সাংবাদিকতা করতে করতে রাজনীতির মধ্যে ঢুকে যাই। আমরা দেখেছি, একটা শাসনকাল যখন থাকে তখন একদল সাংবাদিক সেই শাসনের পক্ষে থাকে। তারা নেতৃত্বের মধ্যে থাকে। আর অন্য দলের সাংবাদিকেরা চুপি চুপি ঘুরে বেড়ায় এবং তাদের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে থাকে। আবার শাসন যখন বদলায়, তখন সাংবাদিকদের নেতৃত্ব বদলে যায়।'

জনস্বার্থ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ভঙ্গুর

জনস্বার্থ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আজ যতটা অপরিহার্য, ততটাই ভঙ্গুর বলে অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডিশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস। তিনি বলেন, 'বিশ্বজুড়ে তথ্য পরিবেশ এখন গভীর সংকটে। মিথ্যা তথ্য সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা ক্ষয় পাচ্ছে এবং সাংবাদিকেরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল চাপের মুখে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের কাজ শুধু মূল্যবান নয়, অপরিহার্য।'

সুইডেনে গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা বেশি

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে ঢাকায় সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, 'আমি যে দেশ থেকে এসেছি, সেই সুইডেনে গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এটি প্রমাণ করে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন কী অর্জন করতে পারে।' তিনি বলেন, 'যখন সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করে এবং সমাজ স্বচ্ছতাকে মূল্য দেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আস্থা তৈরি হয়। নাগরিকরা আত্মবিশ্বাসী বোধ করেন যে তাদের প্রাপ্ত তথ্যগুলো বিশ্বাসযোগ্য এবং এটি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে বাড়িয়ে তোলে।'

গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে

বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে বলে মনে করেন ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইস। তার মতে, এই মুহূর্তটি পরিবর্তনের বড় সুযোগ। তিনি বলেন, 'সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রেকর্ড ভালো না হলেও এই মুহূর্তটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'

সুজান ভাইস বলেন, 'গত দুই বছরে গণমাধ্যম নিয়ে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, এমআরডিআই, ইউএনডিপি ও ইউনেস্কোর রিপোর্টসহ বিস্তর বিশ্লেষণ ও আলোচনা হয়েছে। এখন বিশ্লেষণের পর্যায় পেরিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। বর্তমান সরকার আলোচনায় আগ্রহী বলে ইঙ্গিত দিয়েছে, ফলে এই সুযোগ এখনই কাজে লাগাতে হবে।'

তিনি বলেন, 'সাংবাদিকরাই গণমাধ্যম। তাদেরকেই এই পরিবর্তনের চালিকা শক্তি হতে হবে এবং পরিবর্তনের রূপরেখা নির্ধারণ করতে হবে। অপতথ্য মোকাবিলা এবং বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে সমাজের সব কণ্ঠস্বর দেশের ভবিষ্যৎ সংলাপে যুক্ত হতে পারবে।'

সম্মেলনের অন্যান্য কার্যক্রম

দুই দিনের এ সম্মেলনে মোট ১২টি সেশন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্ল্যানারি সেশন, থিমেটিক সেশন, মাস্টারক্লাস ও প্যারালাল ট্র্যাক। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সংবাদমাধ্যমের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নিউজরুম রূপান্তর, লিঙ্গ সমতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার মতো বিষয়। উচ্চাঙ্গসঙ্গীত ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা সম্মেলনের প্রথম দিনের কার্যক্রম শেষ হয়েছে।