সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিশ্বব্যাপী সংকটের মুখে। ৩০ এপ্রিল রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) তাদের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স-২০২৬ প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের ১৮০টি দেশের অর্ধেকেরও বেশি দেশ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মাপকাঠিতে ‘কঠিন’ বা ‘অত্যন্ত গুরুতর’ শ্রেণিতে পড়েছে।
২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন গড়
২৫ বছরের জরিপকৃত ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের গড় সূচকে এতটা কম আর কখনো হয়নি। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আইনগত, সামাজিক এবং নিরাপত্তা—এই পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে প্রতি বছর আরএসএফ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আরএসএফ জানিয়েছে, গত এক বছরে আইনি সূচকটি সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে। এর কারণ হিসেবে প্যারিসভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতাকে ক্রমবর্ধমানভাবে ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান
আরএসএফের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ তিন ধাপ পিছিয়ে ১৫২তম অবস্থানে নেমে এসেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবার দুই ধাপ এগিয়েছে বটে, তবু বাংলাদেশের পেছনে, ১৫৭তম অবস্থানে। দুটি দেশই আরএসএফের মাপকাঠিতে ‘কঠিন’ বা ‘অত্যন্ত গুরুতর’ বাস্তবতার শ্রেণিবিন্যাসে। নেপালে আমাদের মতো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। দেশটি তিন ধাপ পিছিয়ে এ বছর ৮৭তম, যা ‘সমস্যাসংকুল’ শ্রেণিবিন্যাসে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা
বাংলাদেশও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ অবস্থান হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার হিস্যা থেকে। অর্থাৎ আন্দোলনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা যে তীব্র ছিল তা বাস্তবায়িত তো হয়ইনি, বরং তা আরও সংকুচিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। আমরা দৃশ্যমান অনেক ঘটনা পাই ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ রাতে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর অফিসে হামলা-অগ্নিসংযোগ, গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিনকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা প্রভৃতি ঘটনা সংবাদক্ষেত্রকে ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে যায়।
রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি গণমাধ্যম
স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় প্রতিটি সরকারই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে নিজস্ব রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে সমস্যাটি কেবল রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারি গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও স্বাধীনতার প্রশ্নটি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। স্বাধীন মতপ্রকাশ তো দূরের কথা, সাংবাদিকদের জীবন বাঁচানোর চিন্তাই ছিল মুখ্য। সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি গভীরতর সংকটের প্রতিফলন, সতর্কবার্তা যা বারবার দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে আরএসএফের প্রতিবেদনে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এ দেশের ইতিহাসে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক সব সময়ই জটিল ছিল। সাংবাদিকদের নিরাপত্তার অনুপস্থিতির শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় ২৯ জানুয়ারি ১৭৮০–এ উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্র ‘হিকি’স বেঙ্গল গেজেট অর দ্য অরিজিনাল ক্যালকাটা জেনারেল অ্যাডভারটাইজার’ প্রকাশিত হলে। হিকির গেজেটের প্রকাশক ও সম্পাদক জেমস অগাস্টাস হিকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতির খবর ছাপতেন। এ জন্য হিকির বিরুদ্ধে মামলা হয়, তাঁকে নির্বাসিত করা হয় এবং দুই বছর পর ৩০ মার্চ ১৭৮২ পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। হিকির গেজেট প্রকাশের প্রায় আড়াই শতাব্দী অতিবাহিত হলেও প্রায় সব শাসকগোষ্ঠী সাংবাদিক দলনে মত্ত থেকেছে, যা সভ্য সমাজে কল্পনা করা যায় না।
নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা ও ডিজিটাল প্যারাডক্স
গণমাধ্যমের মালিকানা কেন্দ্রীকরণ এবং ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাবও ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। ফলে সংবাদ পরিবেশনা অনেক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে একধরনের সমঝোতার ফল—যেখানে সত্য প্রকাশের চেয়ে ক্ষমতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতাকে ‘নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা’ বলা যায়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উত্তরসূরি হিসেবে প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকতার জন্য ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছে। পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার, তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা ভঙ্গের আশঙ্কা এবং ডিজিটাল নজরদারি—এসব উপাদান সংবাদকর্মীদের ওপর অদৃশ্য আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্রমেই স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হচ্ছে। আইন বহুকাল ধরেই নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে—যা গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়ও বটে।
৫ আগস্টের পরও পরিবর্তন নেই
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও এই চিত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো ইতিবাচক রূপান্তর দেখা যায়নি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং হয়রানির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থেকেছে। এতে স্পষ্ট হয় যে সমস্যাটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট সরকারের নীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে।
অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট
অর্থনীতির সঙ্গে সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গণমাধ্যমের মালিকানার অর্থনৈতিক কাঠামোও এই সংকটকে জটিল করে তুলেছে। বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে গণমাধ্যমের মালিকানা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় এবং সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা অনিশ্চিত থাকায় স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রায়ই হোঁচট খায়। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি ক্রমেই বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। সাংবাদিকেরা এখন শুধু রাষ্ট্রীয় চাপ নয়, বরং রাজনৈতিক সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রবাদী হুমকি এবং অনলাইন হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন।
গবেষণার ফলাফল
মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি তত্ত্ব এবং ইউনেসকোর জার্নালিস্ট সেইফটি ইনডিকেটর (২০১৫) প্রয়োগ করে সম্প্রতি ৫১৮ জন সাংবাদিকের ওপর (১৭.৫ শতাংশ ঢাকার আর ৭৬.৭ শতাংশ রাজধানীর বাইরের) একটি গবেষণা করা হয়। গবেষণার ফলাফলে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়। ৩৭.৫ শতাংশ সাংবাদিক তাঁদের পেশাগত কাজের কারণে অন্তত একবার শারীরিক হামলা ও ৬৫.৬ শতাংশ হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন বলে ওই গবেষণায় পাওয়া যায়। ৩৬.৭ শতাংশ সাংবাদিক পুলিশি হয়রানি বা ভীতির কথা উল্লেখ করেছেন। বেশির ভাগ সাংবাদিক (৮৭.৯ শতাংশ) ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা বহুমাত্রিক নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
ডিজিটাল প্যারাডক্স
দেশে ইন্টারনেটের বিস্তার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসার তথ্যপ্রবাহের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই ডিজিটাল পরিসরই নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ফলে তথ্যের প্রবেশাধিকার বাড়লেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে—একটি আধুনিক ‘ডিজিটাল প্যারাডক্স’।
মাহামুদুল হক, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।



