মুজিবনগর দিবসে সরকারি উদ্যোগের অভাব: নাগরিক সমাজের তীব্র হতাশা
মেহেরপুরের মুজিবনগরে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল প্রথম বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন, যা মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। কিন্তু এ বছর দিবসটিতে সরকারের কোনো মন্ত্রী বা কর্মকর্তা শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেননি, যা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে গভীর হতাশা সৃষ্টি করেছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ স্থান পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এই নিস্পৃহতাকে হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ধ্বংস ও সরকারের নির্লিপ্ততা
সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান। তিনি বলেন, জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানকালে ছদ্মবেশী দুর্বৃত্তরা মুজিবনগর কমপ্লেক্স ভাঙচুর করেছে এবং প্রায় ৩০০ ভাস্কর্য ধ্বংস করেছে, যার মধ্যে জাতীয় চার নেতার ভাস্কর্য ও অপারেশন সার্চলাইটের ঘটনাচিত্র অন্তর্ভুক্ত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকার এই হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় উদ্যোগহীন থেকেছে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও সরকারি নির্দেশনার অভাব
আবু সাঈদ খান তার লিখিত বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, জনসাধারণ ও সাংবাদিকদের কাছ থেকে জানা গেছে যে এবার দিবসটিতে সরকারিভাবে কোনো কর্মসূচি নেই এবং কোনো নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, "মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ সরকারের শপথ দিবসে সরকারের এ নিস্পৃহতা আমাদের হতবাক ও ব্যথিত করেছে।" শুধুমাত্র স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও কয়েকটি বাম সংগঠন শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বক্তাদের প্রতিক্রিয়া ও দাবিসমূহ
সংবাদ সম্মেলনে সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্থাপনায় আক্রমণের পেছনে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি কাজ করছে, যারা ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চায়। এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা মুজিবনগর সরকারের গঠনকে জাতির শূন্যতার মুহূর্তে একটি গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন, যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে ভূমিকা রেখেছে।
বাসদের সহসাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন জোর দিয়ে বলেন, "মুজিবনগর গোটা জাতির সম্পদ ও অহংকার, এবং স্মৃতি ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।" নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন মুজিবনগর এলাকার সংরক্ষণকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে অভিহিত করেন।
পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন
সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়:
- মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সসহ দেশজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলোর পুনর্নির্মাণ ও সংরক্ষণ।
- হামলাকারী দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
- রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় মুজিবনগর দিবস পালন।
- মুজিবনগরে নির্মাণাধীন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাদুঘরের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন।
- দলমতের ঊর্ধ্বে নির্মোহভাবে রচিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা।
মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা সরকারিভাবে ১৭ এপ্রিল পালন না করাকে খুবই হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেন, যা এই ঐতিহাসিক দিনের গুরুত্বকে আরও জোরালো করে তোলে।



