বম আদিবাসীদের বিনা বিচারে কারাবাস: ৭০০ দিনে জাতিসংঘের তীব্র উদ্বেগ
পার্বত্য চট্টগ্রামে বম আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্যদের বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরিন থাকার ৭০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। ২০২৪ সালের একটি ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় একাধিক মামলা করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ও মানবাধিকার সংকটের বিস্তারিত
মানবাধিকারকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩০ জন নারী ও শিশু ছিল। বর্তমানে আটজন নারী এখনো বিনা বিচারে কারাগারে বন্দী রয়েছেন। প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কার্যত স্থবির রয়েছে, কোনো অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি এবং জামিনের আবেদন এক আদালত থেকে আরেক আদালতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এ সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক টানাপোড়েন। ২০১৭ সালে বম সম্প্রদায়ের কয়েকজন তরুণ কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) গঠন করেন। ২০২২ সালের অক্টোবরে নিরাপত্তা বাহিনী এই সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে বান্দরবান জেলার রুমা ও থানচি উপজেলায় ব্যাংক ডাকাতি এবং পুলিশের অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ওঠে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের হস্তক্ষেপ ও উদ্বেগ
২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নয়জন বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিনিধিদল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বম আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি আচরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বম জনগোষ্ঠীর ওপর বিদ্যমান দমন-পীড়ন আসলে এ অঞ্চলের আদিবাসী জনগণের বিরুদ্ধে চলমান দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যেরই প্রতিফলন। তাঁরা আরও উল্লেখ করেন, বিভিন্ন সরকারি নির্দেশনা ও সামরিক বিধিনিষেধের কারণে বহু আদিবাসী পরিবারের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত জুমচাষ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়েছে।
খাদ্য ও জীবিকার ওপর বিধিনিষেধের প্রভাব
আদিবাসী বম গ্রামবাসীরা খাদ্য ও নিত্যসামগ্রী পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পড়েছেন। চাল কেনা বা পরিবহনের ওপর বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে এবং তাঁদের নিজেদের উৎপাদিত ফসলের বিপণনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার ফলে বহু পরিবার দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময় আরোপিত এসব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা কার্যত পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর সমষ্টিগত শাস্তি হিসেবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বিনা জামিনে কারাগারে আটক, ব্যাপক ভূমি বেদখল এবং সে অঞ্চলে অতিরিক্ত সামরিকীকরণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা
যদি কোনো বন্দীর বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকে, তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে তা আদালতে উপস্থাপন করা। আর যদি এমন প্রমাণ না থাকে, তবে নারী ও শিশুসহ নিরপরাধ মানুষকে আটকে রাখা হবে স্বেচ্ছাচারমূলক আটক এবং সমষ্টিগত শাস্তির শামিল। এমন আচরণ কেবল দেশের সংবিধানসম্মত অধিকারের লঙ্ঘনই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
কারাগারে আটক বমদের ক্ষেত্রে ৭০০ দিনের বেশি সময় ধরে বিনা বিচারে কারাবাস কোনো প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; এটি ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে একটি গভীর ব্যর্থতা। এই অন্যায়ের সংশোধন অর্থাৎ অভিযোগ ছাড়া আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা—শুধু আইনি দায়িত্বই নয়, এটি একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতাও বটে।
সমাধানের পথ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরিন যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণের অভাবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা সম্ভব হয়নি, তাঁদের মুক্তি দেওয়া আইনের শাসনের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। একই সঙ্গে নির্বিচার গ্রেপ্তার, স্বেচ্ছাচারমূলক আটক এবং বম জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের বিষয়ে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। খাদ্য, জীবিকা ও চলাচলের ওপর সমষ্টিগত বিধিনিষেধ দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বয়ে আনতে পারে না; বরং এটি ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে আরও প্রান্তিক করে তোলে। বাংলাদেশের মূলধারার সাধারণ জনগণ, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—সবাইকে এই সংকটের ন্যায্য সমাধানের জন্য এগিয়ে আসতে হবে।



